চাঁদের বুকে ‘দুর্ঘটনা’! আছড়ে পড়ল SpaceX-এর বিশাল রকেট, টেলিস্কোপে ধরা পড়ল দৃশ্য

বাংলাহান্ট ডেস্ক: চাঁদের বুকে ঘণ্টায় প্রায় ৮ হাজার ৬৯০ কিলোমিটার গতিতে আছড়ে পড়ল স্পেসএক্সের (SpaceX) ফ্যালকন ৯ রকেটের একটি পরিত্যক্ত অংশ। এই শক্তিশালী সংঘর্ষের জেরে তৈরি হওয়া বিশাল ধুলোর মেঘ ধরা পড়েছে চিলিতে অবস্থিত ইউরোপিয়ান সাদার্ন অবজারভেটরির (ESO) ভেরি লার্জ টেলিস্কোপে। শুধু ধুলোর মেঘই নয়, পর্যবেক্ষণে দেখা গিয়েছে সোডিয়াম এবং লিথিয়াম গ্যাসের উজ্জ্বল বর্ণালিও। বিজ্ঞানীদের মতে, এই ঘটনা শুধু একটি মহাকাশ দুর্ঘটনা নয়, বরং চাঁদের ভূতত্ত্ব এবং মহাকাশের আবর্জনার প্রভাব সম্পর্কে নতুন তথ্য জানার একটি বিরল সুযোগ এনে দিয়েছে। সংঘর্ষের ফলে তৈরি হওয়া ধুলোর মেঘ কয়েক মিনিটের জন্য দৃশ্যমান ছিল এবং সেই সময়েই গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে।
চাঁদে আছড়ে পড়ল SpaceX-এর বিশাল রকেট, টেলিস্কোপে ধরা পড়ল দৃশ্য
এই ঘটনাটির সূত্রপাত ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে। সে সময় স্পেসএক্সের (SpaceX) একটি ফ্যালকন ৯ রকেট দুটি লুনার ল্যান্ডারকে মহাকাশে পাঠানোর উদ্দেশ্যে উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল। মিশন সফলভাবে শেষ হওয়ার পর রকেটের মূল অংশ পৃথিবীতে ফিরে এলেও উপরের ধাপ বা আপার স্টেজটি মহাকাশেই থেকে যায়। প্রায় চার টন ওজনের এবং পাঁচতলা বাড়ির সমান উচ্চতার এই ধাতব কাঠামো দীর্ঘদিন মহাকাশে ভেসে থাকার পর চাঁদের মাধ্যাকর্ষণের টানে তার দিকে এগিয়ে যায়। বুধবার গ্রিনিচ সময় সকাল ৬টা ৩৫ মিনিট নাগাদ সেটি চাঁদের ‘টারমিনেটর লাইন’-এ, অর্থাৎ আলো ও অন্ধকারের সীমারেখার কাছে সজোরে আছড়ে পড়ে। বিজ্ঞানীদের প্রাথমিক অনুমান, এই আঘাতে চাঁদের মাটিতে অন্তত ২০ মিটার ব্যাস এবং প্রায় ৫ মিটার গভীর একটি নতুন ক্রেটার তৈরি হয়েছে।
আরও পড়ুন: সফল কেন্দ্রের পরিকল্পনা! হরমুজ থেকে নিরাপদে ভারতে পৌঁছল ৬০ জাহাজ, ফিরলেন ৩,৯৭২ জন নাবিক
সংঘর্ষের স্থানটি এমন এক অঞ্চলে ছিল, যেখান থেকে পৃথিবী থেকে সরাসরি পুরো ঘটনাটি দেখা সহজ ছিল না। তবে সূর্যের আলো ধুলোর মেঘকে আলোকিত করায় প্রায় পাঁচ থেকে দশ মিনিটের জন্য সেটি টেলিস্কোপে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। বস্টন ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর স্পেস ফিজিক্সের জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল শ্মিট জানিয়েছেন, পর্যবেক্ষণ এখনও প্রাথমিক স্তরে থাকলেও ইতিমধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গিয়েছে। তাঁর মতে, ধুলোর মেঘে দেখা সোডিয়ামের উপস্থিতি সম্ভবত চাঁদের মাটি থেকে এসেছে, আর লিথিয়াম গ্যাসের উৎস হতে পারে রকেটের ধ্বংসাবশেষ। এই তথ্য ভবিষ্যতে আরও বিশদ বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে বলে জানিয়েছেন গবেষকরা।
মহাকাশে কৃত্রিম আবর্জনার কারণে এমন সংঘর্ষ অবশ্য এই প্রথম নয়। ২০২২ সালে একটি পরিত্যক্ত চিনা রকেটও চাঁদের বুকে আছড়ে পড়েছিল। তারও আগে ১৯৫৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের লুনা–২ মহাকাশযান চাঁদে নিয়ন্ত্রিতভাবে আঘাত করেছিল। তবে এবারের ঘটনাকে বিজ্ঞানীরা বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন, কারণ রকেটটির ওজন, গতি এবং কোথায় আঘাত করবে—সবই আগে থেকে জানা ছিল। লস অ্যালামস ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির বিজ্ঞানী বেঞ্জামিন ফার্নান্দোর মতে, এটি এক ধরনের ‘নিয়ন্ত্রিত বাস্তব পরীক্ষা’, যার মাধ্যমে চাঁদের অভ্যন্তরীণ গঠন, ভূকম্পন এবং মহাকাশের আবর্জনার প্রভাব নিয়ে আরও নির্ভুল গবেষণা করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতের মহাকাশ মিশনের জন্যও এই তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

আরও পড়ুন: UPI পেমেন্টের ক্ষেত্রে এবার হবে অতিরিক্ত খরচ? কী ইঙ্গিত দিলেন RBI গভর্নর?
আগামী কয়েক দশকের মধ্যে চাঁদে স্থায়ী মানববসতি গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে নাসা এবং বিশ্বের আরও কয়েকটি মহাকাশ সংস্থা। সেই কারণে মহাকাশের পরিত্যক্ত যন্ত্রাংশ কতটা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, তা বোঝা এখন অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। অস্ট্রেলিয়ার স্বিনবার্ন ইউনিভার্সিটির অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্ট ড. সারা ওয়েব জানিয়েছেন, গবেষকরা ধুলোর বিশাল মেঘ তৈরির সম্ভাবনা আগেই অনুমান করেছিলেন, কিন্তু সংঘর্ষের মুহূর্তটি এত কঠিনভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে, তা প্রত্যাশিত ছিল না। যদিও সরাসরি আঘাতের স্পষ্ট ছবি মেলেনি, তবু নাসার ‘লুনার রিকনসাঁস অরবিটার’ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ‘দানুরি’ অরবিটারের ভবিষ্যৎ ছবি থেকে নতুন তথ্য পাওয়ার আশা করছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁদের বিশ্বাস, এই সংঘর্ষে চাঁদের ভেতর থেকে উঠে আসা মাটি ও পাথরের বিশ্লেষণ ভবিষ্যতে চাঁদের গঠন, এমনকি প্রায় ৪৫০ কোটি বছর আগে পৃথিবী-চাঁদ ব্যবস্থার জন্ম সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ সূত্র তুলে ধরতে পারে (SpaceX)।




