হরমুজ সঙ্কটের আবহে এই ছোট দেশের ‘মাস্টারস্ট্রোক’, তৈরি হচ্ছে রেল রুট, এশিয়া থেকে ইউরোপে পৌঁছবে পণ্য

বাংলাহান্ট ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে অনিশ্চয়তার আবহে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নতুন কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতে চাইছে কাজাখস্তান (Kazakhstan)। এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে আরও দ্রুত, নিরাপদ এবং রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল বাণিজ্যপথ গড়ে তুলতে দেশটি প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের বিশাল রেল অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে। মূল লক্ষ্য, চিন থেকে ইউরোপে পণ্য পরিবহণের জন্য সমুদ্রপথের বিকল্প তৈরি করা। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ সংকটের ফলে সমুদ্রপথে ঝুঁকি এবং পরিবহণ ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় বহু চিনা সংস্থা এখন স্থলপথের দিকে ঝুঁকছে। সেই সুযোগকেই কাজে লাগাতে চাইছে কাজাখস্তান। দেশের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন রেল সংস্থা কাজাখস্তান তেমির জোহলির প্রধান নির্বাহী তালগাত আলদিবেরগেনভ জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে রেলপথে পণ্য পরিবহণের চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
হরমুজ সংকটের মাঝেই পণ্য পরিবহনের নতুন উপায় বের করল কাজাখস্তান (Kazakhstan):
এই বৃহৎ পরিকল্পনার কেন্দ্রে রয়েছে তথাকথিত ‘মিডল করিডোর’ বা ট্রান্স-কাস্পিয়ান আন্তর্জাতিক পরিবহণ রুট। এই করিডোরটি চিনকে ইউরোপের সঙ্গে সংযুক্ত করছে কাজাখস্তান, কাস্পিয়ান সাগর, আজারবাইজান, জর্জিয়া এবং তুর্কির মাধ্যমে। তুরস্কের বন্দর ব্যবহার করে এই রুট মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা এবং ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ার সুযোগও তৈরি করছে। প্রায় ৪,২৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই করিডোরের মধ্যে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার সমুদ্রপথ রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রুটের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো সময় সাশ্রয়। প্রচলিত সমুদ্রপথের তুলনায় এই করিডোর ব্যবহার করলে পণ্য প্রায় ১৫ দিন আগেই ইউরোপে পৌঁছে যেতে পারে। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এই রুটের কৌশলগত গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে।
আরও পড়ুন:ঝড়ের গতিতে ছুটছে এলপিজির দাম, আপনার শহরে রান্নার গ্যাসের নতুন রেট কত হল?
সম্প্রতি কাজাখস্তানের রাজধানী আস্তানায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে মধ্য করিডোরকে আরও শক্তিশালী এবং কার্যকর করে তোলার বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়েছে। বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ পরিস্থিতি, জ্বালানি সংকট এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে দ্রুত ও নিরাপদ বাণিজ্যপথের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে উভয় পক্ষই একমত হয়েছে। বৈঠকে কন্টেইনার পরিবহণ বৃদ্ধি, রেল অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং কাস্পিয়ান সাগর অঞ্চলের বন্দর আধুনিকীকরণের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়। কাজাখস্তান জানিয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ইউরোপিয়ান ব্যাঙ্ক ফর রিকনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের আর্থিক সহায়তায় আকতাউ বন্দরে বড় ধরনের আধুনিকীকরণ প্রকল্প চলছে। পাশাপাশি কাস্পিয়ান সাগরে নতুন জাহাজ ও ফেরি পরিষেবা চালুর পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
রেলপথ আধুনিকীকরণের ক্ষেত্রেও দ্রুত অগ্রগতি করছে কাজাখস্তান। চলতি মাসের শুরুতেই আলতিনকল-ঝেতিগেন রেল সেকশনের উন্নয়ন প্রকল্প সম্পন্ন হয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় ২৯৩ কিলোমিটার রেললাইন সংস্কার ও সম্প্রসারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি পাঁচটি নতুন স্টেশন নির্মাণ এবং সাতটি পুরনো স্টেশনের পুনর্নির্মাণের কাজও শেষ হয়েছে। সব মিলিয়ে ১২টি আধুনিক স্টেশন যুক্ত হওয়ায় এই রুটে মালবাহী ট্রেন চলাচলের ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সরকারের দাবি, এই উন্নয়নের ফলে চিন এবং ইউরোপের মধ্যে পণ্য পরিবহণ আরও দ্রুত এবং নিরবচ্ছিন্ন হবে।
বর্তমানে কাজাখস্তান (Kazakhstan) দেশজুড়ে প্রায় ৩,০০০ কিলোমিটার রেল নেটওয়ার্ক আধুনিকীকরণের কাজ চালাচ্ছে। এর মধ্যে ইতিমধ্যেই ৯০০ কিলোমিটারের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। গত এক দশকে দেশটির ট্রানজিট কার্গো পরিবহণ দ্বিগুণ হয়েছে এবং ২০২৪ সালে তা ২৭.৪ মিলিয়ন টনে পৌঁছেছে। কাজাখস্তান সরকারের আশা, ২০২৬ সালের মধ্যে এই পরিমাণ বেড়ে ৫৪ মিলিয়ন টনে পৌঁছাবে এবং ২০২৯ সালের মধ্যে তা ৬৭ মিলিয়ন টন ছাড়িয়ে যাবে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিচ্ছে যে কাজাখস্তান ভবিষ্যতে ইউরেশিয়ান বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে চলেছে।

আরও পড়ুন:জুনেই বঙ্গে আসছেন অমিত শাহ! সীমান্ত পরিদর্শনের পাশাপাশি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
বিশ্ব রাজনীতির পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কাজাখস্তানের (Kazakhstan) এই পদক্ষেপ শুধু অর্থনৈতিক নয়, কৌশলগত দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে উত্তেজনা এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তার আবহে বিকল্প স্থলপথ তৈরির চেষ্টা আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন ভারসাম্য তৈরি করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এই প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে ভবিষ্যতে চিন ও ইউরোপের মধ্যে বাণিজ্যের একটি বড় অংশ মধ্য করিডোরের মাধ্যমে পরিচালিত হতে পারে। সেই সঙ্গে মধ্য এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বও বহুগুণ বেড়ে যাবে।




