0%

অস্কার যেন ‘চক দে ইন্ডিয়া’র শাহরুখ! অদম্য লাল-হলুদ রূপকথার আসল কারিগর

চক্রবৎ পরিবর্তন্তে সুখানি চ দুখানি চ। এই সংস্কৃত শ্লোকের গভীর বাণী জীবনের সবক্ষেত্রেই সত্যি। কিন্তু আমরা তা মনে রাখি না। একটা দল যখন পরপর ছ’টা ম্যাচে হারে, তখন আত্মবিশ্বাস কোথায় পৌঁছয় তা বলাই বাহুল্য। সেই সময় তাদের মনে করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন, অন্ধকার কেটে গিয়ে আলো জ্বলে উঠবেই। কেবল লড়ে যেতে হবে। অস্কার ব্রুজো (Oscar Bruzon) যে সময় ইস্টবেঙ্গলের দায়িত্বে এসেছিলেন, সেই সময় এই কথাটাই মনে করিয়ে দেওয়ার দরকার ছিল। তিনি কীভাবে সেকথা বলেছিলেন, তা জানা নেই। কিন্তু শেষপর্যন্ত ৮টা জয় ও ৪টি ড্র-সহ ২৮ পয়েন্টে শেষ করেছিল লাল-হলুদ। আজ, বৃহস্পতিবাসরীয় রূপকথার রাতের ভিত্তিপ্রস্তর আসলে সেই ঘুরে দাঁড়ানোর মধ্যে দিয়েই নির্মিত হয়েছিল। অস্কার ব্রুজো এক আশ্চর্য স্বপ্নের নির্মাতার নাম। যে স্বপ্ন মনে করিয়ে দেয়, ‘সব পারে, মানুষ সব পারে’… হ্যাঁ, ‘কোনি’র ক্ষিদ্দার সেই সংলাপ, ‘ফাইট কোনি, ফাইট’ মনে পড়ে যাবেই।

এই বিষয়ে আরও খবর

কার্লোস কুয়াদ্রাত সুপার কাপ জিতিয়েছিলেন। দীর্ঘ সময়ের ট্রফি-খরা কেটে গিয়েছিল। বহুদিন পর ডার্বি জয়ও এসেছিল তাঁর আমলেই। কিন্তু অস্কার যে স্বপ্নবৃক্ষ রোপণ করতে পেরেছিলেন, সেটা করে উঠতে পারেননি কুয়াদ্রাত। তাই বিক্ষিপ্ত সাফল্যের বেশি কিছু অর্জন করা হয়নি। অস্কার জানতেন, অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরার বিশ্বাসের সঙ্গে জুড়তে হবে লড়াই। যে লড়াই আসলে ইস্টবেঙ্গল ‘জার্মান’ দলের জন্মদাগ! অস্কার তা জানতেন না হয়তো। কিন্তু বুঝে গিয়েছিলেন দ্রুত। অনুভব করতে পেরেছিলেন ইস্টবেঙ্গল কেবলই একটা ক্লাব নয়। তা বংশানুক্রমে বইতে থাকা এক আবেগ, ভালোবাসার খরস্রোত। যে স্রোতের সামনে ভেসে যায় যুক্তিজাল। পরিস্থিতি যাই হোক, জিততেই হবে। কিন্তু চাইলেই তো হয় না। জীবনটা তো ‘চক দে ইন্ডিয়া’র চিত্রনাট্য নয়। শাহরুখ খানের জন্য চমৎকার সব সংলাপ তৈরি করাই ছিল। তিনি, অস্কার ব্রুজো সেই চিত্রনাট্য লিখেছেন রক্তমাংসের অক্ষরে! যে অক্ষর ছুঁয়ে ইতিহাসের নতুন অধ্যায় আজ থেকে শুরু করল ইস্টবেঙ্গল (East Bengal)। ভারতসেরা হল লাল-হলুদ! সেই সাফল্যের রূপকার যে তিনিই… অস্কার ব্রুজো।

অস্কার ব্রুজো এক আশ্চর্য স্বপ্নের নির্মাতার নাম। যে স্বপ্ন মনে করিয়ে দেয়, ‘সব পারে, মানুষ সব পারে’… হ্যাঁ, ‘কোনি’র ক্ষিদ্দার সেই সংলাপ, ‘ফাইট কোনি, ফাইট’ মনে পড়ে যাবেই।

অস্কার কি সত্যিই একজন স্বপ্নালু মানুষ? না। তিনি বাস্তবের মাটিতে পা রেখে চলেন। বরং কুয়াদ্রাত ছিলেন বেশ আবেগপ্রবণ। অস্কার বাইরে থেকে দেখলে বেশ গম্ভীর। সাংবাদিক সম্মেলনে অনেক সময়ই এমন সব কথা বলেন, যা মুহূর্তে খবরের শিরোনামে ‘বিস্ফোরক’ হিসেবে চিহ্নিত হয়। বৃহস্পতিবারের ম্যাচের আগে পরিষ্কার করে দিয়েছিলেন, জয় নিশ্চিত ধরে নিয়েই চ্যাম্পিয়ন টি-শার্ট তৈরি রাখার পক্ষপাতী আদপেই নন। পরিষ্কার বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি যদি আগে থেকেই উদযাপন নিয়ে ভাবতে শুরু করে দেন, তবে তিনি একজন ‘লুজার’। এই একটি মন্তব্যই বুঝিয়ে দেয়, বাস্তবের মাটিকে পা রেখে কেবলই লড়াই করে যাওয়াটুকু নিয়ে মাথা ঘামিয়েছেন অস্কার। কিন্তু… সেই মানুষটিই কাল জানিয়ে দিয়েছিলেন, রাতে ঘুম আসতে কোনও সমস্যা হবে না তাঁর। কেননা তাঁর চোখে একটা স্বপ্ন আছে। এটাই অস্কার ব্রুজোর সাফল্যের রসায়ন। বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে স্বপ্নের পতাকাকে আকাশে ভাসিয়ে রাখা! অস্কার যখন দায়িত্ব পান, ময়দানে এমন ব্যঙ্গও শোনা গিয়েছিল, ”ইস্টবেঙ্গল আইএসএল পাবে না। কিন্তু অস্কার পেয়েছে।” শেষপর্যন্ত সত্যিই ইস্টবেঙ্গল কোচ হয়ে উঠবেন অস্কার পুরস্কারের মতোই মহার্ঘ, কে ভেবেছিল!

অস্কার ব্রুজো একজন একরোখা মানুষ। নন্দকুমারকে যখন টানা খেলিয়ে যাচ্ছিলেন, প্রশ্ন উঠছিল। কিন্তু তিনি সিদ্ধান্ত বদলাননি। অথচ দীর্ঘ সময়ের ডার্বি-খরা কাটানো ম্যাচের স্কোরার ছিলেন নন্দই। সেই খেলোয়াড়ই যেন কেমন হারিয়ে যাচ্ছিলেন মাঠে! অথচ অস্কার তাঁকে টানা খেলিয়ে বিশ্বাস ফিরিয়ে দিতে থাকেন। ফল, মহামেডানের বিরুদ্ধে নন্দ জ্বলে উঠলেন। সাত গোলে জেতা ম্যাচের শেষ গোলটা তাঁরই ছিল। বাঁ পায়ের মাপা শটের সেই গোল বুঝিয়ে দিয়েছিল নন্দ ফিরছেন। এরপর মুম্বই এফসির সঙ্গে মরণ-বাঁচন ম্যাচের জয়সূচক গোলও তিনিই করেন বক্সের মাথা থেকে নেওয়া অনবদ্য শটে। এখানেই অস্কারের ম্যাজিক। তিনি প্রয়োজনীয় বারুদ জোগাড় করে একজোট করেন। এরপর দরকার থাকে স্রেফ একটা স্ফূলিঙ্গের। যা জন্ম নেয় ওই বারুদমাখা আত্মবিশ্বাস থেকেই। একজন কোচের এটাই কাজ। তিনি মাঠে নামবেন না। সাইডলাইনে দাঁড়াবেন। সেখান থেকে বারুদ ছুঁইয়ে দেবেন কেবল। আগুন জ্বলে উঠবে। উঠবেই।

অস্কার ব্রুজো একজন একরোখা মানুষ। নন্দকুমারকে যখন টানা খেলিয়ে যাচ্ছিলেন, প্রশ্ন উঠছিল। কিন্তু তিনি সিদ্ধান্ত বদলাননি। অথচ দীর্ঘ সময়ের ডার্বি-খরা কাটানো ম্যাচের স্কোরার ছিলেন নন্দই।

‘চক দে ইন্ডিয়া’র কথা মনে পড়ে যায় এখানে এসেই। কবীর খান জানতেন, তাঁর হাতে যে মেয়েরা আছে এরা হয়তো নিজেরাও বিশ্বাস করে উঠতে পারেনি তারা বিজয়ী হতে পারে। সেই বিশ্বাসের বীজ পুঁততে হবে। সঙ্গে অনুশীলনে অনুশীলনে তৈরি করতে হবে জেতার অভ্যাস। অস্কারের আইএসএল সাফল্যকে তাই নিছক ফ্লুক বলে যাঁরা সরিয়ে রাখবেন, তাঁরা একেবারেই ভুল করবেন। মনে রাখতে হবে, ডুরান্ড ও আইএফএ শিল্ডেও ইস্টবেঙ্গল নকআউট পর্বে উঠেছিল। এর মধ্যে ডুরান্ডে ডার্বি জিতে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী মোহনবাগানকে ছিটকে দিয়েও ডায়মন্ড হারবারের কাছে সেমিতে হার। আইএফএ শিল্ডের ফাইনালে মোহনবাগানের কাছে হার। তবে টাইব্রেকারে। একেবারে শেষে গিয়ে ৫-৪ ব্যবধানে। হারটা হারই। তবু ইস্টবেঙ্গল খেলোয়াড়দের (এবং সমর্থকদেরও) মনের ভিতরে অস্কার ধীরে ধীরে বিশ্বাসটা পোক্ত করে দেন, তোমরা পারবে। পারবেই। সেই বিশ্বাসের ফসলই মিলল আজ। আইএসএলে বিজয়ী হল সেই দলটা, যারা গতবারও শেষ করেছিল নবম স্থানে। অস্কার নিজের চোখের সামনেই বদলে দিলেন, বদলে দিতে পারলেন। এরপরও তাঁকে ‘চক দে ইন্ডিয়া’র শাহরুখ বলব না?

এই বিষয়ে আরও খবর

শেয়ার

লিংক

Related Articles

Back to top button

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker