কীভাবে শিকড় ‘পুড়িয়ে’ দিচ্ছে চিন! বাড়ি থেকে পালিয়ে বিশ্বকে জানাচ্ছেন ভবঘুরে তিব্বতি

‘অবাক পৃথিবী! অবাক করলে তুমি!/ জন্মেই দেখি ক্ষুব্ধ স্বদেশভূমি।’ কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য এই কবিতাটি লিখেছিলেন ১৯৪০ সালে। সাড়ে আট দশক পেরিয়ে সেই কবিতাই যেন হয়ে উঠেছে এক বছর পঁচিশের তিব্বতি যুবার জীবনের কথা। ‘স্বদেশ’ ছেড়ে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছেন তিনি। কিন্তু দেশ কে কি বুকের খোঁদল থেকে সরানো যায়! কেউ তা চানও না। চান না চোগিয়াল দাওয়াও। তিব্বতে এমন সময়ে তিনি বেড়ে উঠেছিলেন, যখন শি জিনপিংয়ের বিভিন্ন নীতির প্রবল দংশনে দ্রুত বদলে যাচ্ছিল তিব্বতি সংস্কৃতি। সেই যন্ত্রণাই তাঁকে এগিয়ে চলার সাহস, বলা ভালো ‘দুঃসাহস’ দিয়েছে।
২০১২ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই জিনপিং জোর দিয়েছেন ধর্মকে সম্পূর্ণ ‘চিনা ধাঁচে’ রূপান্তরিত করতে। পাশাপাশি ভিন্ন মতকে দমন করে চিনের সংখ্যালঘুদের উপরে নিয়ন্ত্রণকে আরও কঠোর করতেও শুরু করে দেন তিনি। বিশেষ করে তিব্বত ও পার্শ্ববর্তী শিনজিয়াং অঞ্চলের দিকে বরাবরই রক্তচক্ষু লাল চিনের প্রেসিডেন্ট। ১৯৫০ সালেই তিব্বত চলে গিয়েছিল চিনের দখলে। ১৯৫১ সালে ‘সতেরো দফার চুক্তি’ হয়েছিল। যে চুক্তির অন্যতম শর্তই ছিল তিব্বতের ধর্মীয় স্বশাসন। বোঝা যাচ্ছিল এই ‘স্বশাসন’ আসলে একটা ‘বিভ্রম’ মাত্র। ফলে চুক্তি ঘিরে একটা অবিশ্বাসের বাতাবরণ তৈরি হয়েই ছিল। লাসায় টহল দিচ্ছিল চিনা সৈন্যরা। ১৯৫৯ সালে পরিস্থিতি কার্যতই ফুটন্ত হয়ে ওঠে। এই সময়ই দেশ ছেড়েছিলেন দলাই লামা। ১৯৪০ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে যাঁকে বেছে নেওয়া হয়েছিল পরবর্তী ধর্মগুরু হিসেবে। ততদিনে চিনের মুষ্ঠি ক্রমেই প্রবল হয়ে উঠেছে তিব্বতে।
আরও পড়ুন:
২০১২ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই জিনপিং জোর দিয়েছেন ধর্মকে সম্পূর্ণ ‘চিনা ধাঁচে’ রূপান্তরিত করতে। পাশাপাশি ভিন্ন মতকে দমন করে চিনের সংখ্যালঘুদের উপরে নিয়ন্ত্রণকে আরও কঠোর করতেও শুরু করে দেন তিনি। বিশেষ করে তিব্বত ও পার্শ্ববর্তী শিনজিয়াং অঞ্চলের দিকে বরাবরই রক্তচক্ষু লাল চিনের প্রেসিডেন্ট।
দলাই লামা এখন ৯১। আজও দলাই লামাকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ বলেই মনে করে বেজিং। এদিকে তাঁর উত্তরাধিকারীও তিনিই বাছবেন বলে জানিয়ে দিয়েছেন নবতিপর ধর্মগুরু। যা নাপসন্দ চিনের। এহেন পরিস্থিতিতে চোগিয়ালের সঙ্গে দেখা হয়েছে দলাই লামার। তাঁর কাছে তিনি শুনেছেন স্বদেশের যন্ত্রণামাখা কাহিনি। চোগিয়াল তাঁকে বলেছেন, ”আপনাকে অনেকদিন বাঁচতে হবে এখনও। ৬০ লক্ষ তিব্বতি আপনার মুখের দিকে তাকিয়ে। সকলেই স্বপ্ন দেখেন একদিন ঠিকই ফিরে আসবেন আপনি।”
দলাই লামার কোনও ছবিই এখন আর প্রদর্শিত হয় না তিব্বতে। ঘোরতর নিষিদ্ধ। কোনওমতে তিব্বত ছেড়ে পালিয়ে এসে কাঠমান্ডু পৌঁছে তাঁর এক পূর্ণাবয়ব ছবি দেখে চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি চোগিয়াল। পরে সিএনএনের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি উপুড় করে দিয়েছেন নিজের যন্ত্রণা। জানিয়েছেন, তাঁর প্রজন্মই সম্ভবত শেষ প্রজন্ম, যারা তিব্বতের ইতিহাস, ভাষা ও সংস্কৃতির শিক্ষা পেয়েছে স্কুলে। তাঁর কথায়, ”এখনকার প্রজন্মের সঙ্গে পুরনো প্রজন্মের যোগসূত্রই গড়ে উঠতে চায় না। দাদু-দিদা যদি তিব্বত কিংবা নিজেদের জীবনের কোনও পুরনো গল্প বলতে চান, নতুন প্রজন্মের কাছে তা আর বোধগম্য হয় না।”
১৯৫০ সালেই তিব্বত চলে গিয়েছিল চিনের দখলে। ১৯৫১ সালে ‘সতেরো দফার চুক্তি’ হয়েছিল। যে চুক্তির অন্যতম শর্তই ছিল তিব্বতের ধর্মীয় স্বশাসন। বোঝা যাচ্ছিল এই ‘স্বশাসন’ আসলে একটা ‘বিভ্রম’ মাত্র।
কিন্তু কেন? আসলে চোগিয়াল ও তাঁর সহপাঠীরা তিব্বতি রাজবংশের ইতিহাস, যুক্তিবিদ্যা, দর্শনশাস্ত্র, কবিতা, ভাষাবিজ্ঞান এবং জ্যোতিষশাস্ত্রের মতো বিষয়গুলো নিয়ে পড়াশোনা করতেন—যা তিব্বতি বৌদ্ধ ঐতিহ্যের মূল ভিত্তি। কিন্তু ২০২১ সাল থেকে সে সুযোগ আর নেই। রাষ্ট্র সব স্কুলই নিজের দখলে নিয়ে নিয়েছে। চোগিয়াল জানাচ্ছেন, এখন তাঁর নিজের এলাকার শিশুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে, যেখানে তিব্বতি ভাষা কেবল একটি বিষয় হিসেবে পড়ানো হয়। তিব্বতি সংস্কৃতি শেখানোর পরিবর্তে, তিব্বতি ভাষার পাঠ্যপুস্তকেও কমিউনিস্ট পার্টি ও তাদের সামরিক বাহিনীর গুণগানই গাওয়া হয়। ফলে এখনও অনেক স্কুলপড়ুয়া তিব্বতি ভাষায় কথা বলতে পারলেও তারা আসলে বেশি স্বচ্ছন্দ চিনা ভাষায় কথা বলতে। চোগিয়ালরা চোখের সামনে দেখতে পেয়েছেন কীভাবে তাঁদের শিকড় পুড়ে যাচ্ছে। পুড়িয়ে দিচ্ছে চিন। শিক্ষার সব ধরন ও স্তরে ‘দেশপ্রেম’ জাগিয়ে তুলে সকলকে স্রেফ চিনা ভূখণ্ডের অন্তর্গত করে রেখেই খালাস জিনপিং প্রশাসন। তাতে তাদের নিজস্বতা চূর্ণ হয়ে বাতাসে মিলিয়ে গেলে, যাক না!

এতেই শেষ নয়। ডিজিটাল নজরদারির মাধ্যমে বাইরের বিশ্বের দরজাও বন্ধ করে দিচ্ছে চিন। সাধারণ তিব্বতিদের পক্ষে তথ্য আদানপ্রদানের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে তাই আকাশপথে দেশ ছাড়েন চোগিয়াল। কাজটা সহজ ছিল না। তিনি প্রথমে কাঠমান্ডুতে পৌঁছান। তিব্বতি চেহারার কারণে সবার চেয়ে আলাদা বা দৃষ্টিগোচর হলেও, কোনও সমস্যা ছাড়াই তিনি সেখানে প্রবেশ করেন। তারপর সেখান থেকে ভারতে। ধর্মশালায় দলাই লামার সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা আগেই বলা হয়েছে। চোগিয়াল চান তাঁদের ধর্মগুরু যেন ফিরে যেতে চান দেশে। আর তিনি, বিশ্বকে শুনিয়ে বেড়াবেন কেমন করে তাঁদের সকলের মুঠোর ভিতর থেকে ফসকে যাচ্ছে নিজের ভাষা, সংস্কৃতি- সব! মুঠো শক্ত রেখে স্বদেশের স্বকীয়তা বজায় রাখাই এখন ২৫ বছরের ঝকঝকে যুবার বেঁচে থাকার একমাত্র উদ্দেশ্য।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
শেয়ার
লিংক



