0%

লিভ-ইন করলেই করতে হবে রেজিস্ট্রেশন, নিষিদ্ধ বহুগামিতা! অসমে পেশ বিল

সবদিক নিউজ: দেশজুড়ে ‘এক দেশ, এক নিয়ম’ নীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (ইউসিসি) চালুর পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল বিজেপি শাসিত অসম। সোমবার অসম সরকারের পক্ষ থেকে রাজ্যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর করার উদ্দেশ্যে বিধানসভায় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বা বিল পেশ করা হয়েছে। এই বিলের আওতায় বিয়ে, বিবাহবিচ্ছেদ থেকে শুরু করে সম্পত্তির উত্তরাধিকার—সমস্ত ক্ষেত্রেই রাজ্যের সমস্ত নাগরিকের জন্য একই নিয়ম বলবৎ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি, অসমে এবার ‘লিভ-ইন’ বা একত্রবাসের ক্ষেত্রেও রেজিস্ট্রেশন বা সরকারি নথিভুক্তিকরণ বাধ্যতামূলক করার আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করছে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার সরকার।

মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার অনুপস্থিতিতে তাঁর হয়ে এদিন অসম বিধানসভায় এই বিশেষ বিলটি পেশ করেন রাজ্যের সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী অতুল বোরা। বিলের মূল প্রস্তাবনা অনুযায়ী, সমাজে নারী ও পুরুষের সমান অধিকার সুনিশ্চিত করতেই এই আইন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, বহুবিবাহের মতো প্রাচীন প্রথাগুলি নারীদের সামাজিক ও পারিবারিক অধিকারকে মারাত্মকভাবে খর্ব করে। সেই কারণেই এই বিলের মাধ্যমে অসমে বহুবিবাহ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি, বর্তমান সমাজে লিভ-ইন সম্পর্কের প্রবণতা বাড়তে থাকায়, ভবিষ্যতে যে কোনও ধরনের আইনি জটিলতা এড়াতে এবং বিশেষ করে নারীর সুরক্ষা সুনিশ্চিত করতে একত্রবাসের সম্পর্ককেও বাধ্যতামূলকভাবে সরকারি খাতায় নথিভুক্ত করার প্রস্তাব আনা হয়েছে। এছাড়া, বিয়ের জন্য পুরুষদের ন্যূনতম বয়স ২১ বছর এবং মহিলাদের ক্ষেত্রে তা ১৮ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে এই বিলে।

অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার মতে, এই বিলটি রাজ্যে লিভ-ইন সম্পর্ককে প্রথম বারের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসছে। এই বাধ্যতামূলক রেজিস্ট্রেশনের ফলে একত্রবাসে থাকা সঙ্গীদের আইনি অধিকার যেমন রক্ষা পাবে, তেমনই এই ধরনের সম্পর্ক থেকে জন্ম নেওয়া সন্তানের অধিকারও সমাজে সম্পূর্ণভাবে সুরক্ষিত ও স্বীকৃতি পাবে। তবে মুখ্যমন্ত্রী এটিও স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, এই অভিন্ন দেওয়ানি বিধি অসমে বসবাসকারী তফসিলি জনজাতি বা আদিবাসী সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে কোনওভাবেই কার্যকর হবে না।

উত্তরাখণ্ড ও গুজরাতের পর অসম ভারতের তৃতীয় রাজ্য হিসেবে এই অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকরের পথে এগোচ্ছে। এর আগে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে উত্তরাখণ্ডে প্রথম এবং মার্চ মাসে গুজরাতে এই আইন কার্যকর করা হয়েছিল। এছাড়া মধ্যপ্রদেশেও এই আইনের খসড়া তৈরির জন্য ইতিমধ্যে কমিটি গঠিত হয়েছে এবং গোয়াতে আগে থেকেই নিজস্ব ‘গোয়া সিভিল কোড’ চালু রয়েছে। ২০১৪ সালে কেন্দ্রে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর যে প্রধান তিনটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল—রামমন্দির প্রতিষ্ঠা, ৩৭০ অনুচ্ছেদ বিলোপ এবং দেশজুড়ে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করা—তার মধ্যে প্রথম দুটি পূরণ হলেও জাতীয় স্তরে এখনও দেওয়ানি বিধি কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। সেই আবহে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলি একে একে নিজেদের স্তরে এই আইন কার্যকর করতে তৎপর হয়েছে।

তবে সোমবার বিধানসভায় বিলটি পেশ হতেই তা বিরোধী দলগুলির তীব্র প্রতিবাদের মুখে পড়ে। কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস এবং রাইজোর দলের মতো বিরোধী শিবিরের অভিযোগ, এত বড় এবং সংবেদনশীল একটি আইন পাস করানোর আগে সাধারণ মানুষ, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন কিংবা আইন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কোনও ধরনের পর্যাপ্ত আলোচনা বা সর্বস্তরের মতামত নেওয়া হয়নি। বিরোধীদের দাবি, এই বিলটি মানুষের ব্যক্তিগত ও ধর্মীয় অধিকারের ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারে, যা রাজ্যের সামাজিক ও ধর্মীয় ভারসাম্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে মুসলিম সংগঠনগুলির একাংশ ইতিমধ্যেই এই আইন নিয়ে গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। এই তীব্র বাদানুবাদের আবহে আজ মঙ্গলবার বিধানসভায় এই বিতর্কিত বিলটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা ও ভোটাভুটি হওয়ার কথা রয়েছে।

Related Articles

Back to top button

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker