0%

হাজার বছরের ধর্মচর্চা, আর্জেন্টিনার জার্সি নীল-সাদার নেপথ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ইতিহাস!

লিওনেল মেসি, দিয়েগো মারাদোনা, মারিও কেম্পেস। প্রত্যেকের হাতেই বিশ্বকাপ ট্রফি। পরনে নীল-সাদা জার্সি। এই আইকনিক জার্সি ছাড়া আর্জেন্টিনাকে ভাবাই যায় না। মাঝে সূর্যের লোগো। আর্জেন্টিনার পতাকার মতোই। কিন্তু কীভাবে এই জার্সি পেল ‘লা আলবিসেলেস্তে’রা? তার গল্প জানতে গেলে ফিরে যেতে হবে হাজার বছর পিছনে। পার করতে হবে রক্তমাখা ইতিহাসের পাতা।

গল্পটা শুরু করা যাক ইউরোপ থেকে। ১০৫৪ সালে খ্রিস্টান চার্চ দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। তার মধ্যে একটা ছিল বাইজেন্টিয়াম চার্চ। সেই সময় ইউরোপে নীল রঙ সহজে পাওয়া যেত না। একমাত্র আজকের আফগানিস্তান অঞ্চল থেকে আসা লাপিস লাজুলি পাথরের মাধ্যমে নীল রঙ তৈরি করা যেত। যা দুর্লভ, তা হয়ে গেল পবিত্র। বাইজেন্টিয়াম অর্থোডক্স চার্চ নীল রঙকে পবিত্র হিসেবে দেখা শুরু করে। মাতা মেরিকে নীল-সাদা শাল দেওয়া হত। যেহেতু সমুদ্র পার থেকে আসত, তাই এই বিশেষ নীল রঙকে বলা হত ‘আল্ট্রা মেরিন’।

১৯৬৭ সালে আঁকা মাতা মেরির ছবি

এবার চলে আসা যাক উনিশ শতকে। স্প্যানিশ ঔপনিবেশিকতার থেকে মুক্তির লড়াই করছে আর্জেন্টিনার বাসিন্দারা। স্প্যানিশ রয়্যাল বাহিনীর রঙ ছিল সাদা-লাল-সোনালি। তাই আর্জেন্টিনার জন্য একটা নিজস্ব পরিচয় দরকার ছিল। সেটা নিয়ে এলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী ম্যানুয়েল বেলগ্রানো। ১৮১২ সালে প্রথম যুদ্ধ পতাকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটল আর্জেন্টিনার নীল-সাদা পতাকার। বহু রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর স্প্যানিশ ঔপনিবেশিকতা থেকে মুক্তি পায় আর্জেন্টিনা। ওই নীল-সাদা পতাকা প্রথম ওড়ানো হয়েছিল রোসারিও শহরের পারানিয়া নদীর ধারে। আর রোসারিও শহরে কার জন্ম জানেন তো? লিওনেল আন্দ্রেস মেসির।

FIFA World Cup 2026: History of Argentina Football Team Jersey
গোলের পর আর্জেন্টিনার সেলিব্রেশন। ছবি সংগৃহীত।

কিন্তু বেলগ্রানো কেন নীল-সাদা রংটাই বেছে নিলেন? অনেকে বলেন, মুক্ত আকাশের রং বোঝাতে নীল ও তাতে মেঘের প্রতীক হিসেবে সাদা বেছে নেওয়া হয়। নাকি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীকে রুখে দেওয়া বুয়নেস আইরেসের সেনাদের যুদ্ধ প্রতীকের রং হিসেবে। কিন্তু একটা জনপ্রিয় মত হচ্ছে, সেই মেরি মাতার শালের নীল-সাদা রং। ১৮১৮ সালে তাতে জুড়ল ৩২টা রশ্মিওয়ালা সূর্যের ছবি। যা ইনকা দেবতা সূর্যের প্রতীক। এভাবেই নীল-সাদা হয়ে উঠল আর্জেন্টিনার পতাকা।

FIFA World Cup 2026: History of Argentina Football Team Jersey
আর্জেন্টিনার স্বাধীনতা যোদ্ধা বেলগ্রানো

কিন্তু শুরুতে ফুটবল দলের জার্সিতে এরকম নীল-সাদা স্ট্রাইপ ছিল না। দক্ষিণ আমেরিকার দেশে ফুটবল এসেছিল ব্রিটিশদের হাত ধরে। উনিশ শতকের শেষ দিকে সে দেশে ফুটবল ফেডারেশন তৈরি হয়। ১৯০১ সালে উরুগুয়ের বিরুদ্ধে যখন তারা ম্যাচ খেলে, তখন জার্সির রং ছিল পুরো আকাশি। অনেকটা উরুগুয়ের জার্সির মতোই। এরপর ১৯০৮ সালে সাও পাওলোতে ব্রাজিলের এক ফুটবল ক্লাবের বিরুদ্ধে প্রথম নীল-সাদা স্ট্রাইপ দেওয়া জার্সি পরে খেলে। শুরু হল ঐতিহাসিক এক সফর। সেই যাত্রা এত বছর ধরে চলে এসেছে।

FIFA World Cup 2026: History of Argentina Football Team Jersey
১৯৭৬ সালে বিশ্বজয়ী আর্জেন্টিনা

গল্পটা এখানেই শেষ হয়ে যেতে পারত। কিন্তু আর্জেন্টিনা মানে শুধু নীল-সাদা নয়। গাঢ় নীল রঙের আরও একটি জার্সি আছে। যে জার্সি ২০১৪ ফাইনালে মেসিদের হৃদয়ভঙ্গ দেখেছে, আবার ১৯৮৬-তে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে মারাদোনার সেই একক দক্ষতার অবিস্মরণীয় গোলের সাক্ষী। মজার বিষয়, ওই জার্সির জন্ম নিতান্তই দুর্ঘটনা। একটা ‘ভুল’ থেকে। ১৯৮৬-র বিশ্বকাপ হয়েছিল মেক্সিকোয়। প্রবল গরমের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য নীল-সাদা ‘হোম’ জার্সিটি বিশেষভাবে বানানো হয়েছিল। তবে অ্যাওয়ে জার্সিটির দিকে অতটাও মনোযোগ দেওয়া হয়নি। গ্রুপ পর্বে সব ম্যাচ নীল-সাদা জার্সিতেই খেলেন মারাদোনারা। বিপদ বাঁধে কোয়ার্টার ফাইনালে উরুগুয়ের বিরুদ্ধে ম্যাচে। প্রবল বৃষ্টিতে অ্যাওয়ে জার্সি ভারী হয়ে যায়। সেমিফাইনালে সামনে ইংল্যান্ড। ফের ওই জার্সি পরে নামলে দল নির্ঘাত সমস্যায় পড়বে। অতএব শুরু হল নতুন জার্সির খোঁজ।

FIFA World Cup 2026: History of Argentina Football Team Jersey
১৯৮৬ সালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে মারাদোনা। ফাইল ছবি

প্রথমে জার্সি প্রস্তুতকারক সংস্থাকে এই সমস্যার কথা জানানো হয়। তারা পত্রপাঠ জানিয়ে দেয়, এত তাড়াতাড়ি নতুন জার্সি বানানো সম্ভব নয়। অতএব? দলের সঙ্গে থাকা দুই কর্মকর্তা রওনা দেন বাজারের দিকে। একটি দোকান থেকে দুটো নীল জার্সি বেছে নিয়ে আসেন। দুটোই নিতান্ত সাদামাটা। কোনও নম্বর বা লোগো নেই। কোচ কার্লোস বিলার্দোর কোনও জার্সিই পছন্দ হয়নি। সেই সময় মঞ্চে প্রবেশ মারাদোনার। দুটো জার্সির মধ্যে একটি বেছে নিয়ে তিনি বলেন, “এই জার্সিটা দেখতে খুব সুন্দর। এটা পরেই আমরা ইংল্যান্ডকে হারাব।” আর কোনও কথা হতে পারে না। ব্যস, জার্সি নিয়ে আবার ফিরে যাওয়া হল দোকানে। কিনে আনা হল ৩৮টি জার্সি। সমস্যা তখনও মেটেনি। দ্রুত আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের লোগো হাতে সেলাই করে বসানো হল। জার্সি নম্বর বসানো হল আমেরিকার ফুটবল জার্সির আদলে। ১৯৮৬ সালের ২২ জুন, সেই ঐতিহাসিক ম্যাচ। ওই দিনই ‘হ্যান্ড অফ গড’-এর কলঙ্ক। আবার ওই দিনই ৬ জন ফুটবলারকে কাটিয়ে মারাদোনার বিখ্যাত গোল। সেবার বিশ্বকাপও জেতে আর্জেন্টিনা। তারপর ২০২২-এ যন্ত্রণা ঘোচে। লিওনেল মেসির হাতে ওঠে বহুপ্রতীক্ষিত বিশ্বকাপ। সেই জার্সিও এখন আইকনিক হয়ে গিয়েছে। এবারও কি সেই ভাগ্য হবে আর্জেন্টিনার?

শেয়ার

লিংক

Related Articles

Back to top button

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker