0%

How Tulu became a millionaire overnight

দিনভর দিনমজুরি আর সন্ধ্যায় গৃহশিক্ষকতা করে নিজের সংসার চালাতেন তিনি। সকাল থেকে মাথায় ঝুড়ি চাপিয়ে গাড়িতে পাথর তুলে দেওয়ার মতো শ্রমসাধ্য কাজ করতে করতে যখন শরীর আর চলত না, তখনও পরিবারের কথা ভেবে বাড়ি ফিরে স্নান সেরেই নিজের ভাঙা সাইকেলে চড়ে ছোট ছেলে মেয়েদের পড়াতে পৌঁছে যেতেন তিনি। সংসারের নূন্যতম খরচ টানতে নিজেকে দিনের পর দিন এভাবেই কাজ করে যেতে হয়েছিল তাঁকে। এই পর্যন্ত পড়ার পর যদি মনে হয়, এটা অঞ্জন চৌধুরীর কোনও সিনেমায় রঞ্জিত মল্লিকের চরিত্রের কাহিনি, তা হলে সম্পূর্ণ ভুল! এটা কোনও কাল্পনিক চরিত্রের গল্পও নয়, কোনও নায়কের গল্পও নয়, বরং বীরভূম তথা পশ্চিমবঙ্গে পাথর ব্যবসার ‘বেতাজ বাদশা’ তথা কুখ্যাত পাথর ও বালি মাফিয়া টুলু মণ্ডল ওরফে মহম্মদ নাজিবুদ্দিনের জীবনের শুরুর দিকের গল্পটা কিছুটা এরকমই। আজ যে লোকটার কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি আছে বলে শোনা যায়, বছর পঁচিশেক আগে এভাবেই জীবন চলত সেই টুলু মণ্ডলের জীবন। কিন্তু কোন সোনার কাঠির ছোঁয়ায় তাঁর জীবন রাতারাতি বদলে গেল? কীভাবে বা তিনি এই বিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতি হয়ে উঠলেন? বিশেষ করে তাঁর আত্মীয় মিনারের বাড়ি থেকে ২৮ কোটি নগদ আর বিপুল সোনা উদ্ধারের পর এই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। পুলিশ সূত্রে খবর, বিপুল এই সম্পত্তির মালিক আদৌতে টুলুরই, যা রাখা ছিল মিনারের বাড়িতে।

২০১৬ সালে অনুব্রত মণ্ডলের স্নেহধন্য হওয়ার সুবাদে ডিসিআরের টোল গেট পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই তার জীবনের মোড় ঘুরে যায়। শুরুতে বাড়ির এলাকা সোঁতশাল টোলগেটের। পরে ওই এলাকার আরও ছ’টি টোলগেটের। সেখান থেকেই তাঁর ফুলে ফেঁপে ওঠা।

তৃণমূল আমলে পাথরের ডিসিআর (ডুপ্লিকেট চালান রিসিপ্ট) জালিয়াতি করেই টুলু মণ্ডলের রকেটের গতিতে উত্থান বলে জানা যায়! যদিও শুরুটা হয় এর আগে থেকেই। স্থানীয় সূত্রে খবর, বাম আমলে দিনমজুরির কাজে যারা নিয়মিত মহম্মদবাজারের পাথর খাদান এলাকায় আসত, তাদের মধ্যে টুলু সকলের থেকেই আলাদা ছিল, কারণ সে শিক্ষিত ছিল। এই শিক্ষাকে কাজে লাগিয়েই দিনমজুরির কাজ করতে করতেই গাড়িতে পাথর চাপানোর ইজারা নেন টুলু। সেখান থেকে কিছুটা টাকা রোজগার করে ধাপে ধাপে কয়েকটি লরি কিনে নিজেই হাত পাকান পাথর পরিবহণের ব্যবসায়। ধীরে ধীরে আর্থিক স্বচ্ছলতার মুখ দেখতে শুরু করেন তিনি। দ্বিতীয় ধাপে রাজ্যে তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় আসার পর দলের জেলা ও রাজ্য স্তরের নেতারা বুঝতে পারেন, মহম্মদবাজারে মাটির তলায় পাথরের নয় বরং টাকার খনি রয়েছে। সেখান থেকে বিপুল রোজগার করা সম্ভব। স্বাভাবিকভাবেই এই এলাকার উপর নজর পড়ে নেতাদের, আর আবারও নিজের শিক্ষিত মাথাকে কাজে লাগিয়ে নেতাদের সঙ্গে পাথর ব্যবসায়ীদের সখ্যতার নিরিখে প্রথম স্থানে চলে আসেন টুলু মণ্ডল। এতে টুলুর উত্থানের পথ আরও প্রশস্ত হয়। তবে ২০১৬ সালে অনুব্রত মণ্ডলের স্নেহধন্য হওয়ার সুবাদে ডিসিআরের টোল গেট পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই তার জীবনের মোড় ঘুরে যায়। শুরুতে বাড়ির এলাকা সোঁতশাল টোলগেটের। পরে ওই এলাকার আরও ছ’টি টোলগেটের। সেখান থেকেই তাঁর ফুলে ফেঁপে ওঠা।

বিধানসভা ভোটের আগে নিউটাউনে একটি গাড়ি থেকে ৫ কোটি টাকা উদ্ধার করে এসটিএফ, সেই ঘটনাতেও নাম জড়িয়েছিল টুলু মণ্ডলের।

বেসরকারি সংস্থার হাতে ডিসিআর দেখভালের দায়িত্ব তুলে দেওয়ার পেছনে সরকারি উদ্দেশ্যটি বেশ মহৎ ছিল, কোনও সাধু ব্যবসায়ী যাতে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যেতে না পারে, তার জন্য নজরদারি চালাতেই এই ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু অনুব্রত মণ্ডল-সহ তৎকালীন তৃণমূল নেতৃত্বদের ঘনিষ্ঠ টুলু মন্ডলের হাতে এই দায়িত্ব যাওয়ার পরই তৈরি হতে থাকে জাল ডিসিআর। যার অর্থ হল, টুলু মণ্ডলের কর্মীরা সরকার নির্ধারিত টাকা আদায় করার পর চালকদের হাতে যে রিসিপ্ট দিত, সেটাই নকল। অর্থাৎ চালক জানল যে সে সরকারকে প্রাপ্য টাকা দিয়ে ব্যবসা করছে কিন্তু আদপে সেই টাকা সরকারি কোষাগারে পৌঁছাচ্ছে না। রাস্তায় যারা যারা সেই কাগজ পরীক্ষা করতেন অর্থাৎ ভূমি সংস্কার দপ্তরের আধিকারিক, প্রশাসনিক আধিকারিক এবং পুলিশ- প্রত্যেকেই এই দুর্নীতির ভাগ পেতেন। ফলে নকল ডিসিআর থাকলেও গাড়ি চালাতে কোনও অসুবিধা হতো না চালকদেরও। এই প্রক্রিয়ায় দৈনিক কয়েক কোটি টাকা করে রোজগার করেছে টুলু, সঙ্গে কোনও চালান ছাড়াই চলত তার নিজের প্রায় ২৫০ লরি। এভাবেই টুলু মণ্ডল গত ৮ বছরের মধ্যেই কয়েক হাজার কোটি টাকার সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন বলে জানা যাচ্ছে৷ সেই হিমশৈলেরই একটা ছোট্ট চূড়া বুধবার মিনার মণ্ডলের বাড়ি থেকে উদ্ধার হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।

নগদ সাড়ে ২৮ কোটি ও ৫০ লাখের সোনা উদ্ধারের পর গ্রেপ্তার মিনার মণ্ডল।

স্থানীয়দের থেকে শুরু করে বিজেপির নেতা সকলেরই দাবি, এই টাকা মিনারের বাড়িতে থাকলেও টাকার আসল মালিক টুলু মণ্ডলই। সেই টাকার ভাগ তৃণমূল আমলে দলের জেলা থেকে রাজ্য নেতৃত্ব পর্যন্ত সব জায়গাতেই পৌঁছে যেত বলেও অভিযোগ। বিধানসভা ভোটের আগে নিউটাউনে একটি গাড়ি থেকে ৫ কোটি টাকা উদ্ধার করে এসটিএফ, সেই ঘটনাতেও নাম জড়িয়েছিল টুলু মণ্ডলের। বছর দুয়েক আগে বলিউডের তারকাদের উপস্থিতিতে সিউড়িতে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে টুলু মণ্ডলের মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানও শহর বা জেলা ছাড়িয়ে রাজ্যের অন্যতম আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছিল। যা নিয়ে সরব হয়েছিলেন তৎকালীন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী-সহ অনেকেই। জেলা পুলিশ সুপার বিদীত রাজ ভুন্দেশও জানান, যে বাড়ি থেকে এই টাকা উদ্ধার হয়েছে, সেই মিনার মন্ডল পুলিশের জেলায় শিকার করেছেন টুলু মন্ডলের নেতৃত্বে যে সিন্ডিকেট চলত, এই টাকা সেই সিন্ডিকেটেরই। ফলে গোটা ঘটনায় এফআইআরে নাম জুড়েছে টুলুরও। তবে কানাঘুঁষো শোনা যাচ্ছে, এই সবের থেকে অনেকটা দূরে টুলু এখন বিদেশের মাটিতে আছেন।

তৃণমূল আমলে একবার টুলুর সিউড়ির বাড়িতে ইডির হানাও হয়, কিন্তু বিশেষ কিছুই উদ্ধার হয়নি। ২০২২ সালে একটি খুন, হুমকি, অস্ত্র প্রদর্শনের মামলায় তাকে গ্রেফতারও করে মহম্মদবাজার থানার পুলিশ। যদিও এই গ্রেফতারি আসলে টুলুকে ইডি বা সিবিআই হেফাজতে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য করা হয় বলেই জানা গিয়েছিল, যে কারণে খুনের অভিযোগ সত্ত্বেও মাসখানেকের মধ্যেই জামিন পেয়ে যান তিনি। টুলু মণ্ডলের নিজের নামে এবং স্ত্রী, ছেলে ও মেয়ের নামে দুবাইয়ে একগুচ্ছ সম্পত্তি আছে বলেও জানা যায়। তবে পালাবদলের পরেই টুলুর ব্যবসা কার্যত বন্ধ হয়ে গিয়েছে।

শেয়ার

লিংক

Related Articles

Back to top button

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker