শুধু আধার বা ভোটার কার্ডে হবে না! ভারতীয় নাগরিকত্ব নিয়ে বড় রায় কলকাতা হাইকোর্টের

বাংলা হান্ট ডেস্ক : আধার কার্ড, ভোটার কার্ড কিংবা প্যান কার্ড থাকলেই ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণ হয়ে যায়—দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত এই ধারণাকে স্পষ্টভাবে খারিজ করল কলকাতা হাইকোর্ট (Calcutta High Court)। আদালত জানিয়ে দিয়েছে, এই নথিগুলি বিভিন্ন সরকারি পরিষেবা, আর্থিক লেনদেন বা পরিচয় যাচাইয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও নাগরিকত্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রে এগুলির কোনওটিই চূড়ান্ত আইনি প্রমাণ নয়। ফলে কোনও ব্যক্তির নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠলে শুধু এই পরিচয়পত্র দেখিয়ে আইনি স্বীকৃতি পাওয়া সম্ভব হবে না।
কোন মামলায় গুরুত্বপূর্ণ রায় দিল কলকাতা হাইকোর্ট (Calcutta High Court) ?
হাইকোর্ট, মুর্শিদাবাদের লালগোলা ডিটেনশন সেন্টারে আটক নাসির নামে এক ব্যক্তিকে ঘিরে হওয়া একটি মামলার শুনানিতে এই পর্যবেক্ষণ করেছে। প্রশাসনের দাবি, তিনি বাংলাদেশ থেকে বেআইনিভাবে ভারতে প্রবেশ করেছিলেন। অন্যদিকে তাঁর আত্মীয় সুমন মোল্লা আদালতে দাবি করেন, নাসির ভারতীয় নাগরিক এবং সেই দাবির সমর্থনে একাধিক সরকারি নথি জমা দেন। আদালতে পেশ করা হয় ভোটার পরিচয়পত্র, আধার কার্ড, প্যান কার্ড এবং ইউনাইটেড ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার একটি পাসবই।
বিচারপতিরা দেখতে পান, জমা দেওয়া নথির তথ্যের সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয়ের বিবরণে একাধিক অসামঞ্জস্য রয়েছে। শুনানির সময় নিজের পারিবারিক শিকড় সম্পর্কেও সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি নাসির। এমনকি তাঁর স্থায়ী বাসস্থানের তথ্যও আদালতের সামনে তুলে ধরতে পারেনি।
এরপরই হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ নাগরিকত্ব সংক্রান্ত আইনি অবস্থান স্পষ্ট করে। বিচারপতি দেবাংশু বসাক ও বিচারপতি মো. শবর রশিদ জানান, ভোটার কার্ড কাউকে ভোটাধিকার দেয়, নাগরিকত্বের চূড়ান্ত স্বীকৃতি নয়। একইভাবে আধার কার্ডের উদ্দেশ্য একজন বাসিন্দার পরিচয় ও ঠিকানা নথিভুক্ত করা। ২০১৬ সালের আধার আইনের কোথাও এটিকে নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। প্যান কার্ড বা ব্যাঙ্কের পাসবই সম্পর্কেও আদালতের বক্তব্য স্পষ্ট। এই নথিগুলি কর ব্যবস্থা, ব্যাঙ্কিং পরিষেবা এবং আর্থিক লেনদেনের জন্য তৈরি। ফলে এগুলির অস্তিত্ব কোনও ব্যক্তির জাতীয়তা বা নাগরিকত্বের প্রশ্নের নিষ্পত্তি করতে পারে না।
হাইকোর্টের মতে, কোনও ব্যক্তির নাগরিকত্ব নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলে তিনি যে ভারতীয় নাগরিক, সেই দাবি প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব তাঁর নিজের। প্রয়োজনীয় জন্ম-সংক্রান্ত নথি,পারিবারিক বংশপরিচয়ের প্রমাণ বা আইনে গ্রহণযোগ্য অন্য দলিলের মাধ্যমেই সেই দাবি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। শুধুমাত্র পরিচয়পত্র পেশ করলে আইনি দায় পূরণ হয় না।

আরও পড়ুন : ‘টুলু’ কাণ্ডে মুখ খুললেন শুভেন্দু! পুলিশি অভিযানের খুঁটিনাটি জানিয়ে কড়া বার্তা মুখ্যমন্ত্রীর
হাইকোর্টের এই রায়ের ফলে সাধারণ মানুষের জন্য একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে গেল। আধার, ভোটার কার্ড, প্যান কার্ড বা ব্যাঙ্কের পাসবই দৈনন্দিন জীবনে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হলেও সেগুলিকে নাগরিকত্বের প্রমাণ বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। নাগরিকত্ব নিয়ে আইনি প্রশ্ন উঠলে আদালত পরিচয়পত্র নয়, আইনে স্বীকৃত নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত নথিকেই গুরুত্ব দেবে। কলকাতা হাইকোর্টের এই পর্যবেক্ষণ ভবিষ্যতের নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত মামলাগুলির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।




