0%

সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা-সাহিত্যে জীবন্ত দলিল! পর্যটনের মানচিত্রে ফিরছে মামা-ভাগ্নে পাহাড়

দুবরাজপুরের লাল মাটির বুক চিরে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা মামা-ভাগ্নে পাহাড় কেবল একটি প্রাকৃতিক নিদর্শন নয়, এটি বাংলা সাহিত্য, সিনেমা এবং লোকঐতিহ্যের জীবন্ত স্মারক। বহু বছর ধরে অবহেলা ও অযত্নে জৌলুস হারানো এই পাহাড়কে ঘিরেই এবার নতুন আশার আলো দেখা দিয়েছে। রাজ্য বাজেটে প্রস্তাবিত ‘শক্তিপীঠ ট্যুরিজম সার্কিট’-এ মামা-ভাগ্নে পাহাড়ের পাশাপাশি প্রখ্যাত সাহিত্যিক শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের আদি বাড়িকে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ পর্যটনপ্রেমী ও সংস্কৃতিমনস্ক মানুষের মধ্যে নতুন প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছে। এই পাহাড়ের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে রয়েছে বাংলা চলচ্চিত্রের স্মৃতি।

অস্কারজয়ী চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় তাঁর ‘অভিযান’ ছবির জন্য খুঁজছিলেন এক রুক্ষ, অনুর্বর ভূদৃশ্য-যেখানে প্রকৃতির নির্জনতা মানুষের অন্তর্গত অস্থিরতা ও নিঃসঙ্গতার প্রতীক হয়ে উঠবে। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত সেই ছবিতে মামা-ভাগ্নে পাহাড়ের এবড়োখেবড়ো পাথর, শুষ্ক প্রান্তর ও লাল মাটির বিস্তার যেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় অভিনীত চরিত্র নরসিংহের মানসিক টানাপোড়েনেরই দৃশ্যমান রূপ হয়ে উঠেছিল। সিনেমার পর্দায় ধরা পড়া সেই পাহাড় আজও চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে এক বিশেষ আকর্ষণ।

শুধু সিনেমাই নয়, সত্যজিৎ রায়ের সাহিত্যেও এই পাহাড়ের অমোঘ উপস্থিতি রয়েছে। তাঁর ফেলুদা কাহিনি ‘রবার্টসনের রুবি’তে মামা-ভাগ্নে পাহাড় ও তার রহস্যময় পাথরকে ঘিরে থাকা লোককথা গল্পে এনে দিয়েছে অন্য মাত্রা। বাস্তব ও কল্পনার সেই মেলবন্ধন আজও পাঠকদের কৌতূহলী করে তোলে।

দুবরাজপুরের আর এক গর্ব শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়। সাহিত্যিক ও চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে তাঁর অবদান বাংলা সংস্কৃতির অমূল্য সম্পদ। তাঁর আদি বাড়িকেও এই পর্যটন সার্কিটে যুক্ত করার পরিকল্পনা সাহিত্য-অনুরাগীদের জন্য নিঃসন্দেহে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বাম আমলে এলাকার পর্যটনকে চাঙ্গা করতে মামাগভাগ্নে পাহাড়কে ঘিরে গড়ে ওঠা সুসজ্জিত পার্ক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলে তার সৌন্দর্য। এবার সেই অতীতকে পেছনে ফেলে নতুন করে সংস্কার, সৌন্দর্যায়ন ও পর্যটন পরিকাঠামো গড়ে তোলার ভাবনা সামনে এসেছে। দুবরাজপুরের বিধায়ক অনুপ সাহার মতে, জেলার শক্তিপীঠগুলির সঙ্গে মামা-ভাগ্নে পাহাড়, শৈলজানন্দের বাড়ি এবং আশপাশের ঐতিহাসিক স্থানগুলিকে একসূত্রে বাঁধা গেলে গড়ে উঠবে এক অনন্য সাংস্কৃতিক ও পর্যটন পরিক্রমা। সেই স্বপ্ন বাস্তব হলে লাল মাটির এই পাহাড় আবারও সাহিত্য, সিনেমা ও ইতিহাসের আলোয় বাংলার পর্যটন মানচিত্রে নিজের প্রাপ্য স্থান ফিরে পাবে।

শেয়ার

লিংক

Related Articles

Back to top button

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker