বাস চালক থেকে ৫০ কোটির ‘সেফ হাউস’, অনুব্রত ঘনিষ্ঠের ‘পাথর সম্রাট’ হয়ে ওঠার নেপথ্য কাহিনি কী?

AK Banglar Desk: বাংলার মানুষ সেদিন চমকে উঠেছিল। তৎকালীন শিক্ষা মন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের বান্ধবী অর্পিতা মুখোপাধ্যায়ের বাড়ি থেকে কোটি কোটি টাকা উদ্ধার হয়েছিল। টাকা গুনতে আনা হয়েছিল টাকা গোনার মেশিন। টেলিভিশনের পর্দায় সেই ছবি দেখেছিল বাংলার আমজনতা। ঘরের মধ্যে যে টাকার পাহাড় থাকতে পারে এর আগে মানুষের কল্পনাতেই ছিল না। বুধবার বীরভূম জেলার মহম্মদ বাজারে যেন সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। বাংলার আরো এক প্রান্ত থেকে আবারও টাকার পাহাড়ের সন্ধান। এবার টাকার সঙ্গে সোনা। ভরি ভরি নয়, কেজি কেজি। একসঙ্গে ১৫ কেজি সোনা। নগদ টাকা সাড়ে ২৮ কোটি টাকা। সোনার মূল্য ধরলে ৫০ কোটি টাকারও বেশি।
কোথা থেকে এল এত টাকা? এই টাকা ও সোনার উৎস কী? ইতিমধ্যে এই নিয়ে শুরু হয়েছে জোর চর্চা। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের বীরভূম জেলার বেতাজ বাদশা অনুব্রত মণ্ডল ওরফে কেষ্ট-ঘনিষ্ঠ এক ব্যবসায়ীর আত্মীয়র বাড়ি থেকে এই কোটি কোটি টাকার সম্পদের সন্ধান মিলেছে। এখন অবশ্য ‘ভাল’ তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন অনুব্রত, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ছেড়েছেন। ঋতব্রত-তৃণমূলের জেলা সভাপতির দায়িত্বও পেয়েছেন অনুব্রত।
বীরভূম জেলায় ‘বালি ও পাথর মাফিয়া’ হিসাবে খুব পরিচিত নাম টুলু মণ্ডল। অনেকে বলে থাকেন বীরভূমের পাথর সাম্রাজ্যের ‘মুকুটহীন সম্রাট’। ভাল নাম মহম্মদ নিজাম উদ্দিন। অনুব্রত মণ্ডলের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী এই নিজাম উদ্দিন। এই ব্যবসায়ীর আত্মীয় মিনার মণ্ডল। বীরভূমের মহম্মদবাজারের দেউচায় ১৪ নম্বর জাতীয় সড়কের ধারে অবস্থিত মিনারের বাড়ি। তার বাড়ি থেকেই নগদ টাকা ও সোনা মিলিয়ে ৫০ কোটি টাকারও বেশি উদ্ধার হয়।
কে এই মিনার মণ্ডল? তদন্তকারী পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, মিনার এক সময় সরকারি বাসের চালক ছিলেন। কয়েক বছর আগে তিনি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। এলাকার মানুষের সঙ্গে খুব একটা মিশতেন না। একেবারেই সাধারণ জীবন যাপন করতেন। চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর টুলু মণ্ডলের পাথর ব্যবসা সামলাতে এই মিনার। হিসাব রাখা থেকে লেনদেন সবই দেখতেন তিনি। কুলু মণ্ডলের খুবই বিশ্বাসভাজন ছিলেন এই মিনার মন্ডল। অবৈধভাবে উপায় কামানো এই বিপুল পরিমাণ কালো টাকা ও সোনা নিরাপদে রাখতে তার বিশ্বাসভাজন আত্মীয় মিনার মণ্ডলের ওপর আস্থা রেখেছিলেন টুলু মণ্ডল। সেই মিনারের ‘সেফ হাউস’ থেকেই উদ্ধার হল কোটি কোটি টাকা ও কেজি কেজি সোনা।
এ তো গেল মিনার মণ্ডলের কথা। এই কালো টাকার মূল মালিক মহম্মদ নিজাম উদ্দিন ওরফে টুলু মণ্ডলের বেতাজ বাদশা হয়ে ওঠার গল্পটাই বা কী? কিভাবে হয়ে উঠলেন বীরভূমের বালি ও পাথর কারবারের ‘মুকুটহীন সম্রাট’? বীরভূমের আকাশে বাতাসে কান পাতলে শোনা যায় এর পিছনে রয়েছে অনুব্রত মণ্ডলের হাত মাথায় রাখা। তদন্তকারী অফিসার সূত্রে জানা গিয়েছে কেষ্টর আশীর্বাদে টুলু মণ্ডলের এই উত্থান। তৃণমূল সরকারে থাকাকালীন অনুব্রত মণ্ডলের ইশারায় যাবতীয় ‘ কুকর্মের অংশীদার এই টুলু মণ্ডল। নামে-বেনামে বেআইনি খাদান, ক্রাসার চালানো থেকে জেলা জুড়ে রয়্যালিটি ফাঁকির যাবতীয় চক্র নিয়ন্ত্রণ হতো তার হাত দিয়েই। এমনকি পাথর বলয়ের প্রশাসনিক চেকগেট গুলির অলিখিত মালিকও ছিলেন তিনিই।
বীরভূমের মহম্মদ বাজার থানার সোঁতশালের মোড়লপাড়ায় বাড়ি টুলু মন্ডলের। সিনেমার মতোই তার উত্থান। প্রথমে তিনি লরিতে পাথর সরবরাহের কাজ করতেন। পরে শেয়ারে একটি ডাম্পার কেনেন। তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার কয়েক বছরের মধ্যেই অনুব্রত মণ্ডলের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন তিনি। মেয়ের বিয়েতে কোটি কোটি টাকা খরচ করেছিলেন টুলু। ১০০ কোটি টাকা খরচ করে মেয়ের বিয়ে দেন। যেখানে বলিউড ও টলিউডের তারকারা উপস্থিত হয়েছিলেন। তারকা তালিকায় ছিলেন আরবাজ খান, জারিন খান, আসরানি, অঙ্কুশ আরও অন্যান্যরা। ইতিমধ্যে পুলিশের জালেমিনার পলাতক টুলু।



