দারিদ্র পেরিয়ে রূপকথার দেশে! ইস্টবেঙ্গলের ‘নায়ক’ ডেভিড আজও গোলের পর খোঁজেন বাবাকেই

আইএফএ সেমির শুরুতেই বিশ্রী পরিস্থিতি। আলাদিনের গোলে নর্থইস্ট ইউনাইটেড এগিয়ে গিয়েছে। ম্যাচের বয়স তখন দেড় মিনিট। আচমকাই যখন পিছিয়ে পড়েছে লাল-হলুদ, কয়েক মিনিটের মধ্যেই বল ভাসালেন ক্রিস। সেই বলে মাথা ছোঁয়ালেন ২৪ বছরের এক তরুণ। তাঁকে সকলে বিলক্ষণ চেনেন। এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ টু-তে ‘ঐতিহাসিক জয়ে’রও অন্যতম কারিগর তিনি। নাম ডেভিড লালহানসাঙ্গা (David Lalsansanga)। এই মুহূর্তে ভারতীয় ফুটবলের অন্যতম ‘ডার্ক হর্স’!
অবিশ্বাস্য ফুটবল খেলে এদিন ম্যাচটা শেষপর্যন্ত জিতেছে ইস্টবেঙ্গল (East Bengal)। আর সেই জয়ের অন্যতম ‘নায়ক’ ডেভিড করেছেন দুরন্ত হ্যাটট্রিক। খেলার শেষে কোচ হাবাস তাঁকে কী বলেছেন তা জানা নেই। কিন্তু গোলগুলির পর যে আকাশের দিকে একবার তাকিয়ে দেখেছেন ডেভিড সেটা সকলেরই জানা। প্রতিটি গোলের পরই প্রয়াত বাবাকেই যে তিনি আকাশের নীলে খুঁজে বেড়ান!
জন্ম অসমে হলেও মাত্র এক বছর বয়সেই মিজোরামে চলে আসে ডেভিডের পরিবার। সেখানেই বেড়ে উঠছিলেন। এরপরই ছন্দপতন। বাবা লালকুং গাংতে শৈশবেই প্রয়াত হলে পরিবারে নেমে আসে দারিদ্রে গাঢ় কালো ছায়া! মা জামি গাংতে অনেক কষ্টে বড় করেছেন ডেভিডকে। তিনি এবং ভাইবোনরা সকলেই আজ গর্বিত দাদাকে নিয়ে। কিন্তু তিনি ডেভিড জানেন, মা-বাবার আশীর্বাদ ও শুভ কামনা ছাড়া আজ এই দিন তিনি দেখতে পেতেন না।
যেন মতি নন্দীর কোনও ক্রীড়া-উপন্যাসের প্রধান চরিত্র। মা বাজারে সবজি বিক্রি করতেন। এমনকী পাথর খাদানেও কাজ করেছেন। ছোট থেকেই ছেলেটার পায়ে বল পড়লেই যেন ম্যাজিক ঘটে যেত। কিন্তু কে জানত ফুটবলে পা রেখেই ডেভিড পৌঁছে যাবেন রূপকথার রঙিন দুনিয়ায়। যে রং এখন লাল-হলুদ! ইস্টবেঙ্গলের জার্সি গায়ে এএফসিতে ইতিহাস গড়ার পর এদিনের সোনালি হ্যাটট্রিক ডেভিডকে পৌঁছে দিল নতুন শৃঙ্গে।
ময়দানের ঘাস চেনেন যাঁরা তাঁরা অনেকেই কিন্তু ২০২৩ সালেই পড়ে ফেলেছিলেন ডেভিডের ভাগ্যরেখা! সেবার কলকাতা লিগে মহামেডানের হয়ে একাই ২১টি গোল করেছিলেন তিনি। এরপর ডুরান্ডেও হাফ ডজন। এমনকী, আই লিগেও পাঁচটি। গোলের পর গোল। ছোট্ট ছেলেটি এআইএফএফ উদীয়মান বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার পেয়ে যান সেই বছর। তখনই বোঝা গিয়েছিল আগামিদিনে ডেভিড কী করতে চলেছেন! যাঁরা সেদিনই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, আজ তাঁদের আনন্দের দিন! ক’দিন আগে এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ টু-র ম্যাচে ইস্টবেঙ্গল ফিরে এসেছিল নিশ্চিত হারের মুখ থেকে। ৯০ মিনিট পর্যন্ত খেলায় ০-১ পিছিয়ে লাল-হলুদ। আচমকাই জয় গুপ্তার দুর্দান্ত হেডে জাল কেঁপে যায়। ১-১ থাকা অবস্থায় অতিরিক্ত সময়ের খেলা শুরু হয়। ইস্টবেঙ্গল ম্যাচ জেতে ৪-১ গোলে। তৃতীয় গোলটি ছিল ডেভিডের।
সেই ডেভিড এদিন একাই তিনটি গোল করলেন। বিপরীতে আলাদিনের মতো খেলোয়াড় জোড়া গোল করেও শেষপর্যন্ত হার মানলেন লাল-হলুদ ঝড়ের সামনে। আর সেই ঝড়ের অন্যতম কাণ্ডারী হয়ে উঠলেন ডেভিড। কুয়াদ্রাতের আমলে ক্লাবে সই করলেন, অস্কার ব্রুজো কিন্তু সেভাবে সুযোগ দিচ্ছিলেন না। নামাতেন অনেকটা সময় পরে। কিন্তু হাবাস তাঁকে ভরসা করতেই মাঠে ফুল ফোটালেন ডেভিড।
তবু শেষপর্যন্ত মাটিতে পা রেখেও আকাশে চোখ তাঁর। মেঘ কিংবা চাঁদ-তারা নয়, প্রতিটি সোনালি মুহূর্তে সেখানে যে নিজের হারিয়ে যাওয়া বাবাকে খোঁজেন ডেভিড। জানেন কেবল ওখানেই দেখা হয়ে যাবে তাঁর সঙ্গে! ছোটবেলায় হারিয়ে ফেলা মানুষটার সঙ্গে ভাগ করে নেবেন সমস্ত সুখের পারানি! জানিয়ে দেবেন, মা-বাবার লড়াইকে ব্যর্থ হতে দেননি তিনি। লিখতে শুরু করেছেন নিজস্ব রূপকথা। আগামিদিনে আরও নতুন নতুন অধ্যায় গড়ার দিনেও যে আকাশেই চোখ থাকবে তাঁর, তা বলাই বাহুল্য।
শেয়ার
লিংক



