অতীতের ছায়া, দুর্নীতির জাল! কেমন হল নন্দিতা-শিবপ্রসাদের ‘বহুরূপী ২’?

অপরাধের জগৎ থেকে বেরিয়ে এসে নতুন করে সংসার পাততে চেয়েছিল বিক্রম প্রামাণিক। কিন্তু অতীত কি এত সহজে পিছু ছাড়ে? আর যখন রক্ষকই ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তখন অপরাধী আর অপরাধের মধ্যে ফারাকটাই বা কোথায় থাকে? এই প্রশ্নগুলিকেই সামনে রেখে ফিরেছে নন্দিতা রায় ও শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ‘বহুরূপী ২’। ২০২৪ সালের ব্লকবাস্টার ‘বহুরূপী’র সাফল্যের পর সিক্যুয়েল ঘিরে প্রত্যাশা ছিল তুঙ্গে। এবার বিক্রমের লড়াই শুধু পুলিশের সঙ্গে নয়, বরং এমন এক দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে, যার শিকড় অনেক গভীরে। কিন্তু প্রথম ছবির ম্যাজিক কি ধরে রাখতে পারল এই নতুন অধ্যায়?
প্রথম ছবিতে দেখা গিয়েছিল, খুনের অভিযোগে অন্যায়ভাবে জেলে যেতে হয় বিক্রম প্রামাণিককে। কারাবাসের সময় এক সহবন্দির কাছ থেকে ব্যাঙ্ক ডাকাতির কৌশল শেখে সে। জেল থেকে বেরিয়ে ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্পী বহুরূপীর ছদ্মবেশকে হাতিয়ার করে একের পর এক ডাকাতি চালায় বিক্রম। তার পিছনে পড়েন সৎ পুলিশ আধিকারিক সুমন্ত ঘোষাল, যে চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন আবির চট্টোপাধ্যায়।
‘বহুরূপী ২’-এর গল্প শুরু হচ্ছে ২০১৫ সালের আশপাশে। অপরাধের পথ ছেড়ে স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে শান্তিতে জীবন কাটাতে চায় বিক্রম। কিন্তু তার অতীত সম্পর্কে ওয়াকিবহাল পুলিশ আধিকারিক অয়ন বন্দ্যোপাধ্যায়ের (যিশু সেনগুপ্ত) আগমন সব হিসেব ওলটপালট করে দেয়। নিজের লাভজনক জেলায় পোস্টিং বাঁচাতে বিক্রমকে ফের ডাকাতির কাজে নামতে বাধ্য করে অয়ন। ফলে একসময় যে ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল বিক্রম, সেই ব্যবস্থারই দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিনিধিদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে সে।
বিক্রমের একটি সংলাপেই ছবির মূল বক্তব্য স্পষ্ট। অতীতে সে সরকারের বিরুদ্ধে কাজ করত, আর এখন সরকারের লোকেদের সঙ্গে হাত মিলিয়েই সরকারের বিরুদ্ধে কাজ করছে। এই দ্বন্দ্বই ছবির গল্পকে এগিয়ে নিয়ে যায়। তবে দুর্নীতি, লোভ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিষয়গুলি আরও গভীরভাবে তুলে ধরার সুযোগ থাকলেও চিত্রনাট্য সেই পথে খুব বেশি এগোয়নি।
নন্দিতা রায় ও শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের চিত্রনাট্যে আগের ছবির মতোই রয়েছে মেলোড্রামা, হাস্যরস, অ্যাকশন ও সাসপেন্সের মিশেল। তবে এবার সেই পরিচিত ফর্মুলা কিছুটা অনুমানযোগ্য হয়ে উঠেছে। প্রথমার্ধে গল্পের গতি ধীর, নতুন চরিত্রের আনাগোনায় মূল কাহিনি শুরু হতেও সময় নেয়। প্রায় ২ ঘণ্টা ৪৮ মিনিটের ছবিতে বেশ কিছু দৃশ্য অপ্রয়োজনীয়ভাবে দীর্ঘ মনে হয়।
একজন অপরাধী সংশোধিত হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চাইলেও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থা কীভাবে তাকে ফের অপরাধের দিকে ঠেলে দেয়, তা বহু ছবিতেই দেখা গিয়েছে। ‘বহুরূপী ২’ সেই পরিচিত ভাবনাকেই নতুন করে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছে। কিন্তু বিক্রমের পরিবার এবং তার সাধারণ জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষাকে গল্পে আরও গুরুত্ব দেওয়া হলে লোভ ও নৈতিকতার সংঘাত অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠতে পারত।
বিক্রম প্রামাণিকের চরিত্রে শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় আবারও ছবির প্রধান শক্তি। নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েও বিক্রমের প্রতি দর্শকের সহানুভূতি তৈরি করতে তাঁর অভিনয় সাহায্য করে। চরিত্রটির মধ্যে থাকা জেদ, বুদ্ধি এবং পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা তিনি সাবলীলভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
অন্যদিকে, যিশু সেনগুপ্ত অয়ন বন্দ্যোপাধ্যায়ের চরিত্রে দাপট দেখানোর চেষ্টা করেছেন। বিক্রম ও অয়নের ইগোর লড়াই, তীক্ষ্ণ সংলাপ এবং একে অপরকে টেক্কা দেওয়ার মুহূর্তগুলি উপভোগ্য। তবে কে শেষ পর্যন্ত এগিয়ে থাকবে, তা অনেকটাই অনুমেয়। প্রথম ছবিতে আবির চট্টোপাধ্যায়ের সুমন্ত ঘোষাল চরিত্রটির যে সংযত ও বিশ্বাসযোগ্য উপস্থিতি ছিল, যিশুর অয়নের চরিত্রায়ণে সেই গভীরতার কিছুটা অভাব রয়েছে।
আরও পড়ুন: মহিলাদের পোশাক, ওজন, চেহারা নিয়ে এত বিচার কেন? ট্রোলিংয়ের বিরুদ্ধে সরব কৃতি শ্যানন
অয়নের স্ত্রী রেশমির চরিত্রে সোহিনী সরকার কাহিনিতে গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা যোগ করেছেন। অর্থ, সোনা ও সামাজিক প্রতিপত্তির প্রতি তাঁর আকর্ষণ স্বামীকে আরও উচ্চাকাঙ্ক্ষী করে তোলে। তাঁদের সম্পর্কের মধ্যে ক্ষমতা ও লোভের যে সমীকরণ রয়েছে, তা আকর্ষণীয় হলেও চিত্রনাট্যে যথেষ্ট বিকশিত হয়নি। পার্শ্বচরিত্রে চন্দন সেন ও প্রদীপ ভট্টাচার্যও নিজেদের মতো করে গল্পে অবদান রেখেছেন।
বড় বাজেটের ছাপ ছবির দৃশ্যায়নে স্পষ্ট। বিভিন্ন লোকেশনে শুটিং এবং আদিবাসী সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যবাহী গম্ভীরা লোকশিল্পের ব্যবহার গল্পকে আলাদা আবহ দিয়েছে। দৃশ্যগতভাবে ছবিটি বেশ সমৃদ্ধ। বনি চক্রবর্তীর ‘বিলাই মিঁয়াও মিঁয়াও রে’ গানটি জনপ্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। তবে গানগুলির প্রয়োগ সব সময় কাহিনির সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে মিশে যায়নি। কিছু ক্ষেত্রে মনে হয়েছে, গল্পের প্রয়োজনে নয়, বরং বিনোদনের উপাদান বাড়াতেই গানগুলি রাখা হয়েছে।
আরও পড়ুন: মানসিক অবসাদের চিকিৎসা চলছিল সুশান্তের, অভিনেতার মৃত্যু নিয়ে আজও আক্ষেপ স্মিতা জয়করের!
‘বহুরূপী’ বাংলা বাণিজ্যিক সিনেমায় নতুন করে আশা জাগিয়েছিল। তার সিক্যুয়েল ‘বহুরূপী ২’ সেই প্রত্যাশার পুরোপুরি মর্যাদা দিতে না পারলেও একেবারে হতাশ করেনি। চেনা গল্পের ছক, দীর্ঘ রানটাইম এবং কিছু চরিত্রের অসম্পূর্ণ বিকাশ ছবির দুর্বলতা। অন্যদিকে, শিবপ্রসাদের অভিনয়, যিশুর সঙ্গে তাঁর দ্বৈরথ, আকর্ষণীয় দৃশ্যায়ন এবং সংলাপ ছবিটিকে উপভোগ্য করে তুলেছে। সব মিলিয়ে, প্রথম ছবির মতো স্মরণীয় না হলেও ‘বহুরূপী ২’ বাংলা সিনেমায় একটি সম্ভাবনাময় ফ্র্যাঞ্চাইজির ভবিষ্যৎ নিয়ে কৌতূহল জিইয়ে রাখে।
ছবির নাম: বহুরূপী: দ্য গোল্ডেন ডাকু
অভিনয়ে: শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, যিশু সেনগুপ্ত, কৌশানি মুখোপাধ্যায়, সোহিনী সরকার, চন্দন সেন, প্রদীপ ভট্টাচার্য ও রজতাভ দত্ত।
পরিচালনা: নন্দিতা রায় ও শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়
রেটিং: ৩/৫
আরও পড়ুন: কিশোর কুমারের ছেলে হয়েও স্বতন্ত্র পরিচিতি, জানুন অমিত কুমারের জীবনের অজানা অধ্যায়



