0%

শুরুতে ‘অভিশপ্ত’ সাদা জার্সি, দেশজোড়া হাহাকারের মাঝে কীভাবে হলদে হল ব্রাজিল?

ব্রাজিল ফুটবল টিম বলতে কী কী মনে পড়ে? সাম্বা, জাদু, পাঁচটা বিশ্বকাপ। আর? আর আইকনিক হলুদ রং। তাতে সবুজের ছোঁয়া। নীল রঙের শর্টস। ব্রাজিলের পতাকার রঙে মেলানো। কিন্তু জানেন কি, শুরুতে হলুদ নয়, সাদা জার্সি পরে বিশ্বকাপ খেলত সেলেকাও? কিন্তু আজ সাদা জার্সি তাদের কাছে অভিশপ্ত। এক ভয়ানক বিভীষিকা জার্সির রঙের সঙ্গে বদলে দেয় ব্রাজিলের ইতিহাস। শেষমেশ ১৮ বছর বয়সি এক সদ্য যুবকের হাতে শাপমুক্তি ব্রাজিলের। না। তিনি পেলে নন। তাঁর নাম আলদির গার্সিয়া শ্লি।

২০০২-র বিশ্বজয়ী ব্রাজিল দল

গল্পের শুরুটা জানতে পিছিয়ে যেতে হবে আজ থেকে ৭৬ বছর আগে। ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালের আসর বসেছে ব্রাজিলের মারাকানা স্টেডিয়ামে। ফুটবল বিশ্ব ততদিনে সেলেকাওদের সাম্বার ঝলকের সঙ্গে পরিচিত, কিন্তু বিশ্বকাপ জেতা হয়নি। এবার ঘরের মাঠে প্রথমবার বিশ্বজয়ের লক্ষ্য। নীল কলার দেওয়া সাদা জার্সি, প্যান্ট, মোজা পরে তৈরি দল। সামনে তখনের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী উরুগুয়ে। তখনের নিয়ম অনুযায়ী, শুধু ড্র করলেই ব্রাজিল বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন। আর উরুগুয়েকে জিততেই হবে। গোটা দেশ আত্মবিশ্বাসী, মারাকানায় ১ লক্ষ ২০ হাজার দর্শক ধরেই নিয়েছে, চ্যাম্পিয়ন হওয়া সময়ের অপেক্ষা।

FIFA World Cup 2026: How Brazil got its iconic yellow jersey
ব্রাজিল জার্সিতে নেইমার, ভিনিসিয়াসরা

কিন্তু মানুষ যা চায়, তা পায় না। সেদিন মারাকানা ও গোটা দেশকে স্তব্ধ করে দিয়ে ২-১ গোলে জিতেছিল উরুগুয়ে। দেশজুড়ে কান্না, হাহাকার। প্রিয় মানুষের মৃত্যুর থেকেও ভয়ানক সেই যন্ত্রণা। আমাজনের জঙ্গলে সেদিন বোধহয় পিন পড়লেও শব্দ হত। এই হারের দায় কার? সব দোষ গিয়ে পড়ল সাদা জার্সির উপর। সাদা জার্সি দেশাত্মবোধের প্রতীক নয়। এর সঙ্গে ব্রাজিলের শিকড়ের কোনও যোগ নেই। এটা ঔপনিবেশিকতার প্রতীক। তাহলে বদলে ফেলা যাক। ১৯৫৩ সালে একটি পত্রিকা জার্সির ডিজাইনের প্রতিযোগিতা শুরু করে। প্রায় ৩০০ জন অংশগ্রহণ করেন। যেখান থেকে বেছে নেওয়া হয় ১৮ বছরের এক তরুণ চিত্রশিল্পীর ডিজাইন। তাঁর নাম আলদির গার্সিয়া শ্লি।

How Uruguay broke Brazilian hearts in the 1950 World Cup - BBC News
মারাকানায় উরুগুয়ের কাছে হার ব্রাজিলের

প্রায় ১০০টা ভিন্ন ধরনের ডিজাইন তৈরি করেছিলেন গার্সিয়া। তারপর একসময় মনে হল, এত কিছুর তো দরকারই নেই। ব্রাজিলের পতাকার থেকে জমকালো অথচ সহজ-সুন্দর রঙ আর কী হতে পারে! হলুদ খনিজ সম্পদের প্রতীক, সবুজ আমাজনের অরণ্য আর নীল ব্রাজিলের অপূর্ব সুন্দর রাতের ছবি। ব্যস, এতেই তৈরি হয়ে গেল আইকনিক সেই জার্সি। ১৯৫৪ সালে প্রথমবার এই জার্সি পরে খেলে ব্রাজিল। এরপর ১৯৫৮ সালে প্রথমবার বিশ্বজয়। মজার বিষয় ফাইনালে হলুদ জার্সি পরে খেলেনি ব্রাজিল। যেহেতু বিপক্ষে সুইডেন ছিল, তাই নীল জার্সি পরে প্রথমবার জুলে রিমে ট্রফি হাতে নেয় সেলেকাওরা।

The history behind Brazil's yellow uniform | The Business Standard
গার্সিয়ার তৈরি করা ডিজাইন

তারপরের ঘটনা ইতিহাস। ১৯৬২, ১৯৭০, ১৯৯৪ ও ২০০২ সালে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে ব্রাজিল। ওই জার্সি পরে মাঠ দাপিয়েছেন পেলে, গ্যারিঞ্চা, সক্রেটিস, রোমারিও, জিকো, রোনাল্ডো, রোনাল্ডিনহো, কাকা, নেইমাররা। ব্যর্থতা-যন্ত্রণাও এসেছে। তা সত্ত্বেও জার্সিকে শ্রদ্ধা করেন সব ব্রাজিলিয়ান। রাজনীতিও কম হয় না। রাজনীতির কথা যখন উঠলই, তখন গার্সিয়ার কথায় আরেকবার ফেরা যাক।

FIFA World Cup 2026: How Brazil got its iconic yellow jersey
জুলে রিমে ট্রফি হাতে পেলে। ফাইল ছবি

ব্রাজিলের দ্বিতীয় বিশ্বজয়ের দু’বছরের মাথায়, অর্থাৎ ১৯৬৪ সালে মিলিটারি শাসন শুরু হয়। গার্সিয়াকে গ্রেপ্তার করে শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার করা হয়। প্রায় ২০ বছর এই দৌরাত্ম্য চলে। গার্সিয়া তার মধ্যেও নিজের কাজ করে গিয়েছেন। শাসকের অত্যাচারে মাথা নত করেননি। ২০১৮ সালে ক্যানসারে ভুগে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। আকর্ষণীয় বিষয়, মিলিটারি শাসনব্যবস্থায় পরের দিকে ব্রাজিল নয়, সমর্থন করতেন অন্য দলকে। গার্সিয়ার জন্মস্থান পেলোতাস যে দেশের সীমান্তের খুব কাছে অবস্থিত। যে দেশের কাছে হারের পর ব্রাজিল জার্সির রং বদলায়। হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন। গার্সিয়া শেষ দিকে উরুগুয়ের সমর্থক হয়ে গিয়েছিলেন। এটাই হয়তো ফুটবল বিধাতার লিখন।

FIFA World Cup 2026: How Brazil got its iconic yellow jersey
আলদির গার্সিয়া শ্লি। ফাইল ছবি

শেয়ার

লিংক

Related Articles

Back to top button

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker