0%

১২০০০ কিমি দূরের বিশ্বকাপ ঘিরে রক্তাক্ত বাংলাদেশ, শুধুই ফুটবল উন্মাদনা নাকি কারণ গভীর?

তখন অনেক রাত! ঢাকার টিএসসি থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলার অলিগলি, প্রিয় দলের খেলা দেখতে হাজার হাজার মানুষের ঢল। এত ভিড় যে, হাঁটাও কঠিন। কেউ গাছের ডালে বসে, কেউ চারতলার বারান্দার রেলিং আঁকড়ে ঝুলছে! কেউ আবার বৈদ্যুতিক খুঁটির পাশে বিশাল পতাকা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে। এই দৃশ্য প্রথম দেখলে অবাক হতে হয়। দ্বিতীয়বার দেখলে মুগ্ধতা। কিন্তু তৃতীয়বার থেকে একগুচ্ছ প্রশ্ন।

যে দেশ কোনও দিন ফুটবল বিশ্বকাপে খেলেনি, সেখানে ১২০০০ কিমি দূরের বিশ্বকাপ ঘিরে কেন মানুষ প্রাণ হারায়? কেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ ভাঙচুর হয়? কেন বিদ্যুতের তারে ঝুলে নিভে যায় কোনও তরুণ জীবন? ফুটবল অনেকের কাছে শুধু একটি খেলা নয়, আত্মপরিচয়েরও অংশ। তাই প্রিয় দলের জয়কে তারা নিজের জয় আর হারকে নিজের হার বলে মনে করে। কেউ যদি সেই দলকে নিয়ে ঠাট্টা বা অপমান করে, সেটাকেও তারা ব্যক্তিগত অপমান হিসাবে নিয়ে ফেলে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় যা ‘আইডেন্টিটি ফিউশন’। গবেষক উইলিয়াম বি. সোয়ান জুনিয়রের মতে, এটা অনেকটা দলের সঙ্গে নিজের পরিচয় একাকার হয়ে যাওয়ার মতো। তখন আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলের হার মানে নিজের হার, মেসি-নেইমারকে অপমান করা মানে নিজেকে অপমান করা। তাই প্রিয় দলকে নিয়ে কেউ ঠাট্টা করলে খুব সহজেই রেগে যায় তারা। সেই রাগ থেকেই তর্ক, তর্ক থেকে মারামারি, এমনকী প্রাণহানির ঘটনাও পর্যন্ত ঘটে।

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে এই প্রবণতা আরও প্রকট হয়েছে। মিশর-আর্জেন্টিনা ম্যাচকে কেন্দ্র করে টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। আহত হন একাধিক ছাত্র ও শিক্ষক, ভাঙচুর হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পত্তি। এখানেই শেষ নয়, মিশর বনাম আর্জেন্টিনা ম্যাচ চলাকালীন এক চায়ের দোকানে সমর্থকদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। যা এক সময় সংঘর্ষে রূপ নেয়। আর্জেন্টিনা সমর্থক স্থানীয় বাবু ও মইন উদ্দিন মালু নামে দু’জন শরিফুল ইসলামের মাথায় আঘাত করে। পুলিশ জানিয়েছে, স্থানীয়রা আক্রান্তকে উদ্ধার করে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়। খবর পেয়ে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠায়। ‘প্রথম আলো’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পেশায় অটোরিকশাচালক শরিফুল ব্রাজিলের সমর্থক হলেও সেদিন মিশরকে সমর্থন করছিলেন। তাত্ত্বিকরা হয়তো বলবেন, এর পেছনে মানুষের পরিচয়বোধ ও আবেগ কাজ করে। মিশর একটি মুসলিম-প্রধান দেশ হওয়ায় বাংলাদেশের অনেক মানুষ দেশটির সঙ্গে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মিল অনুভব করেন। তাই কেউ কেউ মিশর বা অন্য মুসলিম দেশকে বেশি সমর্থন করেন। এতে সমস্যা নেই। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হল, কিছু ক্ষেত্রে ফুটবল আর শুধু খেলা হিসাবে দেখা হচ্ছে না। এর সঙ্গে ধর্ম, রাজনীতি, দলীয় পরিচয় ও ব্যক্তিগত অহংকার জড়িয়ে যাচ্ছে। তখন খেলার আনন্দ কমে যায়, আর মতভেদ থেকে ঝগড়া ও সংঘর্ষের মতো ঘটনা ঘটতে পারে।

মানুষ স্বভাবগতভাবেই ‘বেঁধে বেঁধে’ থাকতে পছন্দ করে। বিবর্তনের ইতিহাস তার সাক্ষী। মনোবিজ্ঞানী জন টুবি ও লেডা কসমিডেস দেখিয়েছেন, মানুষের বেঁচে থাকার ইতিহাসে দলবদ্ধতা ছিলই। এই গোষ্ঠীগত মানসিকতা থেকেই খুব সহজেই আজও তারা ‘আমরা’, ‘ওরা’ বিভাজনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। অর্থনীতিবিদ স্যামুয়েল বোলস ও আচরণবিজ্ঞানী হারবার্ট গিন্টিস তাঁদের গবেষণায় দেখিয়েছেন, মানুষ নিজের দলের প্রতি বেশি আনুগত্য দেখায়। প্রতিপক্ষকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে দেখে। একে বলা হয় ‘প্যারোকিয়াল অ্যালট্রুইজম’। পাশাপাশি সমাজমনোবিজ্ঞানী অঁরি তাজফেল দেখিয়েছেন, মানুষ খুব সহজেই নিজের দলকে অন্য দলের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। তাই বিশ্বকাপের সময় বাংলাদেশে বিদেশি দলকে ঘিরে তীব্র সমর্থন ও আবেগের স্ফুলিঙ্গ। এসবই গোষ্ঠীগত মানসিকতার প্রকাশ। আজ সেই একই প্রবৃত্তি বিশ্বকাপের রাতে নতুন পোশাকে ফিরে আসে। শুধু যুদ্ধক্ষেত্র বদলেছে। হাতে বর্শা নেই। আছে স্মার্টফোন। যুদ্ধের ময়দান নেই। আছে ফেসবুকের মন্তব্যঘর। কিন্তু মানসিকতা প্রায় একই রয়ে গিয়েছে।

হয়তো এই কারণেই উল্লাসের মুহূর্তই কেড়ে নেয় কোনও তরুণের প্রাণ। যেমন দীপ্ত চৌধুরী। ২৩ বছরের ওই কলেজ পড়ুয়ার বাড়ি শহরের মালিনী রোড এলাকায়। নেত্রকোনা সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি। বুধবার ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা জয় পাওয়ায় রাত তিনটে নাগাদ ছোটবাজার অঞ্চলের শহিদ মিনারের সামনে বহু মানুষ মিছিল বের করেন। তাঁদের হাতে ছিল আর্জেন্টিনার পতাকা, ফেস্টুন। সেই সময় দীপ্তও বন্ধুদের সঙ্গে জায়ান্ট স্ক্রিনে খেলা উপভোগ করে বাড়ি ফেরার পথে। মিছিল দেখে ছবি ও ভিডিও তুলতে তিনি উঠে পড়েন শহিদ মিনার মোড় এলাকায় একটি বাড়ির ছাদে। আর তখনই ঘটে যায় ভয়ংকর এক ঘটনা। অসাবধানতাবশত তড়িদাহত হয়ে নিচে পড়ে যান। পরে স্থানীয় লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। ফুটবল পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। তার সবচেয়ে বড় শক্তি বিভাজন নয়, সংযোগ। ১২ হাজার কিলোমিটার দূরের কোনও ম্যাচ যদি আমাদের প্রতিবেশীর সঙ্গে শত্রুতে পরিণত করে, তবে সমস্যা ফুটবলের নয়, সমস্যা আমাদের সমাজের। বিশ্বকাপ শেষ হবে। পতাকা নামবে। রং মুছে যাবে। সোশাল মিডিয়ায় নতুন বিতর্ক শুরু হবে। কিন্তু যে পরিবার ছেলেকে হারিয়েছে, যে শিক্ষক ছাত্রদের সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে আহত হয়েছেন, যে মা ছাদের দিকে তাকিয়ে এখনও অপেক্ষা করেন– তাঁদের চোখের জল মুছিয়ে দেবে কে? ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা কোনও জাতির সৌন্দর্য হতে পারে। কিন্তু সেই ভালোবাসা জীবনের চেয়ে কখনও বড় নয়।

শেয়ার

লিংক

Related Articles

Back to top button

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker