শিক্ষা, দুর্নীতি আর সরকারি স্কুলের সংকট—দেখার মতো কি ‘আদর্শ বাল বিদ্যালয়’?

কেন্দ্রে একটি সরকারি স্কুল, সীমিত পরিকাঠামো, আর সেই স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের প্রতিদিনের লড়াই—এই প্রেক্ষাপটেই তৈরি হয়েছে সাত পর্বের নতুন সিরিজ ‘আদর্শ বাল বিদ্যালয়’। শিক্ষাব্যবস্থার নানা বাস্তব সমস্যা, সরকারি স্কুলের সংকট এবং সমাজের প্রান্তিক মানুষের স্বপ্নকে সামনে আনতে চেয়েছে এই সিরিজ। বর্তমান সময়ে যখন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে ছাত্র আন্দোলন চলছে, তখন এমন একটি বিষয় নিয়ে সিরিজ তৈরি নিঃসন্দেহে প্রাসঙ্গিক। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরার চেষ্টা থাকলেও, গল্প বলার ধরনে অতিরিক্ত নাটকীয়তা অনেক ক্ষেত্রেই সেই প্রভাবকে দুর্বল করে দিয়েছে।
গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন আদর্শ বাল বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জ্ঞানেশ্বর ত্রিপাঠী, যার চরিত্রে অভিনয় করেছেন কে কে মেনন। তিনি ছাত্রদের শুধু পড়াশোনাই শেখান না, মাঠে নেমে তাঁদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলেন, তাঁদের স্বপ্ন দেখান এবং প্রতিনিয়ত চেষ্টা করেন সীমিত সম্পদ নিয়েও স্কুলটিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে। কিন্তু অর্থাভাব, অবকাঠামোর ঘাটতি এবং প্রশাসনিক জটিলতা তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। একই সঙ্গে বিদেশে যাওয়ার ব্যক্তিগত স্বপ্নও তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা স্ত্রী দীর্ঘদিন ধরে নিঃস্বার্থভাবে সমর্থন করে এসেছেন।
সাতটি পর্বে একাধিক সামাজিক বিষয়কে সামনে আনা হয়েছে। দুর্নীতি, সততা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক, বয়স্কদের প্রতি সম্মান, পেশার মর্যাদা, যৌন শিক্ষা এবং শিক্ষার সমান অধিকার—প্রতিটি বিষয়ই গল্পে জায়গা পেয়েছে। তবে সমস্যা যত দ্রুত উঠে আসে, তার সমাধানও তত সহজে হয়ে যায়। ফলে বাস্তবতার জটিলতা বা চরিত্রগুলির গভীর মানসিক দ্বন্দ্ব খুব একটা ফুটে ওঠে না। সবকিছুই যেন অতিরিক্ত সরলীকৃত।
নবীন কস্তুরিয়া একজন কাউন্সেলরের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন, যিনি নিজের কিশোরী মেয়েকে মানুষ করার পাশাপাশি স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের সমস্যাও বোঝার চেষ্টা করেন। অন্যদিকে অভিমন্যু সিং এক কঠোর স্বভাবের শিক্ষকের চরিত্রে অভিনয় করেছেন, যিনি প্রথমে শাসনের মাধ্যমে ছাত্রদের নিয়ন্ত্রণ করতে চান। পরে তিনি উপলব্ধি করেন, ভয় নয়, ভালোবাসাই শিক্ষার আসল ভিত্তি। তাঁর আর্থিক সমস্যার কারণে অতিরিক্ত আয়ের জন্য মেহেন্দি শিল্পী হিসেবে কাজ করার বিষয়টি চরিত্রটিকে অন্য মাত্রা দিয়েছে।
অর্চনা পুরণ সিং স্থানীয় এক সাংসদের প্রতিনিধির ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। তাঁর চরিত্র প্রায়শই প্রধান শিক্ষকের উদ্যোগে বাধা সৃষ্টি করে। অন্যদিকে নতুন শিক্ষিকার চরিত্রে প্রসন্না বিস্ট সরকারি স্কুলের বাস্তবতা মেনে নিয়ে কাজ করলেও ছাত্রদের মধ্যে বৈষম্যের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, কোনও শিশুকে ‘ভালো’ বা ‘খারাপ’ বলে আলাদা করা যায় না; প্রত্যেকেরই সমান শিক্ষার অধিকার রয়েছে।
তবে সিরিজের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হল, বারবার পরিচিত ক্লিশের আশ্রয় নেওয়া। যৌন শিক্ষার ক্লাসে একজন শিক্ষিকার নির্দিষ্ট শব্দ উচ্চারণে অস্বস্তি কিংবা উত্তর-পূর্ব ভারতের এক অভিনেতাকে শুধুমাত্র চাউমিন রান্না করা ক্যান্টিন কর্মীর চরিত্রে দেখানো—এই ধরনের উপস্থাপনা নতুন কিছু দেয় না। বরং কিছু ক্ষেত্রে তা গতানুগতিক ধারণাকেই শক্তিশালী করে।
অভিনয়ের দিক থেকে কে কে মেনন বরাবরের মতোই অসাধারণ। তাঁর সংযত অভিনয় সিরিজটিকে অনেকটাই টেনে নিয়ে যায়। পাশাপাশি এক শিক্ষক যে ডিসলেক্সিয়ায় আক্রান্ত হতে পারেন, সেই বিষয়টিও সংবেদনশীলভাবে তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু প্রায় প্রতিটি দৃশ্যে হাসির মুহূর্ত তৈরি করার অতিরিক্ত চেষ্টা গল্পের আবেগ এবং বার্তাকে অনেকটাই হালকা করে দেয়।
সব মিলিয়ে ‘আদর্শ বাল বিদ্যালয়’ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে কেন্দ্র করে তৈরি হলেও, শক্তিশালী চিত্রনাটা ও আরও সংযত উপস্থাপনা থাকলে সিরিজটি অনেক বেশি প্রভাব ফেলতে পারত। তা সত্ত্বেও সরকারি স্কুলের বাস্তব সংকট এবং শিক্ষকদের নিরলস সংগ্রামকে সামনে আনার জন্য এই সিরিজ একবার দেখা যেতেই পারে।
অভিনয়: কে কে মেনন, নবীন কস্তুরিয়া, অভিমন্যু সিং, অজিতেশ গুপ্ত, প্রসন্না বিস্ট, অর্চনা পুরণ সিং, অন্নপূর্ণা সোনি, দেবেন ভোজানি, প্রচী শাহ
পরিচালনা: হিমাঙ্ক গৌর
রেটিং: ★★☆☆☆



