নীরব যন্ত্রণা নিয়ে অবসরে ‘হোয়াইটসের’ শেষ পূজারি, রাহানের বিদায়ে সমাপ্ত ‘চারমূর্তি’র যুগ

ক্যাপ নং ২৭৮ সাইনিং অফ!
সমস্ত ক্রিকেট থেকে অবসরের পর অজিঙ্ক রাহানেকে (Ajinkya Rahane Retirement) নিয়ে অসামান্য একটা বিজ্ঞাপন করেছে স্টার স্পোর্টস। ভারতীয় স্লিপ কর্ডনের একটা ছবি দিয়ে।
টেস্ট ‘হোয়াইটস’-এ যেখানে পরপর দাঁড়িয়ে অজিঙ্ক রাহানে-চেতেশ্বর পূজারা-বিরাট কোহলি-রোহিত শর্মা। নিচে লেখা: ‘উইল ইউ মিস ইন্ডিয়াস আইকনিক স্লিপ কর্ডন?’ উত্তরদাতা প্রথমে লিখেছেন, ‘না।’ সঙ্গে সানগ্লাস পরা হাসির ইমোজি। যা দেখে পাল্টা সওয়াল, ‘সানগ্লাসটা একটু খোলো তো!’ প্রত্যুত্তরের ইমোজি সানগ্লাস-বিহীন। কিন্তু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, উত্তরদাতা কাঁদছেন! সব শেষে, ফুটনোটের মতো একখানা বার্তা–‘এভরি এরা হ্যাজ ইটস ফাইনাল চ্যাপ্টার’। সহজ বাংলায়, প্রতিটা যুগেরই একটা করে শেষ পরিচ্ছদ থাকে।
নিখাদ ক্রিকেটপ্রেমীর চেতনাকে সজোরে ধাক্কা দেওয়ার মতো এক বিজ্ঞাপন! সত্যি তো, ৩০ জুলাই, ২০২৬ ভারতীয় ক্রিকেটের এক যুগাবসানের দিন। ভারতীয় ক্রিকেটের মায়া-চতুর্ভুজকে ঘিরে রোম্যান্সের অন্তিম পর্ব। বিরাট কোহলি (Virat Kohli)। রোহিত শর্মা (Rohit Sharma)। চেতেশ্বর পূজারা। অজিঙ্ক রাহানে। ভারতের টেস্ট স্কোয়াডের বিশ্বাসের ফোর মাস্কেটিয়ার্সের কেউ-ই আর যে পড়ে থাকলেন না। প্রত্যেকে ছেড়ে দিলেন, সরে গেলেন। ক্রিকেট উপাসকদের কারও শৈশব, কারও যৌবনকে চিরতরে কেড়ে নিয়ে। বিরাট-রোহিত টেস্ট ক্রিকেট খেলা ছেড়েছিলেন গায়ে-গায়ে। অল্প কয়েক দিনের তফাতে। পুজারা ক’মাস পরে। বাকি ছিলেন পড়ে রাহানে। নাহ্, মুম্বইকরের অন্ধ ভক্তও বিগত কয়েক বছরে বিশ্বাস করেননি, আটত্রিশ বছরের রাহানে আবার টেস্ট টিমে ফিরবেন। প্রত্যাবর্তন করবেন। বরং শেষ ক’টা বছরে যত না প্রশংসার ফুল-চন্দন পেয়েছেন। তার চেয়ে লাঞ্ছনা জুটেছে অধিক। শেষ দু’বছর কেকেআর অধিনায়ক ছিলেন মুম্বইকর। কিন্তু নাইট সমর্থকদের কাছে প্রাপ্য গ্রহণযোগ্যতা কখনও পাননি। রাহানেকে নিয়ে বলার আগে, লোকে বিন্দুমাত্র ভাবেনি, ভারতীয় ক্রিকেটে তাঁর সমুদ্র-অবদান।
Jinks, congratulations on a great career, buddy. You’ve done wonders for Indian cricket, and you can be very proud of your journey. The safest pair of hands in the slips and my favourite Test batting partner. Wishing you well always. God bless. 🤝🇮🇳@ajinkyarahane88 pic.twitter.com/bHGaas41gO
— Virat Kohli (@imVkohli) July 30, 2026
৮৫ টেস্টে ৫০৭৭ রান। বারোটা সেঞ্চুরি। ছাব্বিশটা হাফসেঞ্চুরি। ৯০-টা ওয়ান ডে-তে ২৯৬২ রান। তিন সেঞ্চুরি, চব্বিশ হাফসেঞ্চুরি-সহ। এ সমস্ত তথ্য-প্রমাণাদি না হয় ছেড়েই দেওয়া গেল। অজিঙ্ক রাহানের কাছে ভারতীয় ক্রিকেট কৃতজ্ঞ থাকতে পারে স্রেফ বছর পাঁচেক আগের অস্ট্রেলিয়া সফরের জন্য। যে সফরে অ্যাডিলেড টেস্টে ৩৬ অলআউটের মহলজ্জায় ডুবতে হয়েছিল ভারতকে। কিন্তু তারপরেও বিরাট কোহলি-বিহীন, প্রবল চোট-আঘাতে আক্রান্ত, তারুণ্য নির্ভর এক টিম নিয়ে প্রথম বার অস্ট্রেলিয়া থেকে ভারত টেস্ট সিরিজ জিতে ফেরে অজিঙ্ক রাহানের নেতৃত্বে! ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সেই সিরিজের মেলবোর্ন টেস্টে অস্থায়ী অধিনায়ক রাহানের দুর্ধর্ষ সেঞ্চুরি সিরিজ জয়ের কাঠামো-প্রতিষ্ঠা করে দেয়।

ঐতিহাসিক টেস্ট সিরিজ জয়ের পরেও দ্রুত ‘সেকেন্ড ফিডল’-এর জীবনে মানিয়ে নিতে সামান্যতম অসুবিধে হয়নি রাহানের। বিরাট কোহলি ফিরে এসেছিলেন যে! আসলে বরাবরই কর্ণের জীবন তাঁর। বরাবরই তিনি দ্বিতীয় শ্রেণির পৃথিবীর লোক। প্রথম শ্রেণির দুনিয়ার চাকচিক্য যাঁর বরাতে নেই। সন্দেহাতীত ভাবে, বিদেশে ভারতীয় ব্যাটিংয়ের শ্রেষ্ঠ ভরসা ছিলেন রাহানে। ইয়েস, বিরাট-রোহিত-পুজারারা থাকা সত্ত্বেও। লর্ডসের সবুজকে শাসন করে সেঞ্চুরি, যার নথিপত্র। কিন্তু তার পরেও ভারতীয় ক্রিকেটের দুই রাজাধিরাজ বিরাট-রোহিতের ছায়ায় কেরিয়ারের সিংহাভাগ কাটিয়ে দিতে হয়েছে রাহানেকে। অথচ যে ছ’টা টেস্টে দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন রাহানে, অজেয় থেকেছেন। প্রতিপক্ষের সাধ্য হয়নি, রাহানে নেতৃত্বাধীন ভারতকে হারানোর। কিন্তু তারপরেও কখনও কিছু নিয়ে অনুযোগ করেননি রাহানে। শোনা যায়, পাঁচ বছর পূর্বে ইতিহাসের অস্ট্রেলিয়া-জয় সম্পন্ন করে বাড়ি ফেরার পর রাহানের প্রতিবেশীরা উত্তেজনা-বশে এক আশ্চর্য কেক অর্ডার করেছিল। ক্যাঙারুর ‘টপিংস’-সহ এক কেক। রাহানে নাকি বলেন, কেক তিনি কাটতেই পারেন। কিন্তু ‘টপিংস’ সরালে, তবেই। কারণ, ক্যাঙারু অস্ট্রেলিয়ার জাতীয়তার প্রতীক। সে দেশ থেকে টেস্ট সিরিজ জিতে এসেছেন বলে, তাদের জাতীয় ঐতিহ্যকে তিনি অপমান করতে পারেন না!

সে লোক তো সরে যাওয়ার দিন নীরবে লিখবেনই যে, ‘ক্যাপ নং ২৭৮ সাইনিং অফ।’ পরে ভিডিও বার্তায় বলবেনই যে, ‘‘সব কিছুর শুরু থাকে যেমন, শেষও থাকে। সময় এলে সেই সত্যকে সম্মান জানিয়ে সরে যাওয়াই শ্রেয়। ব্যাটিংয়ের মতো জীবনেও টাইমিংয়ের সঙ্গে কখনও আপস করিনি আমি। আর তাই বলছি, এখন আমার সরে যাওয়াটাই সবচেয়ে সময়োপযোগী কাজ হবে। সব ধরনের ক্রিকেট থেকেই সরে যাচ্ছি আমি।’’
যার অর্থ, আইপিএলও আর খেলবেন না রাহানে। কেকেআরকে নতুন অধিনায়ক খুঁজতে হবে। খুঁজুক তারা। সমর্থক-হৃদয়ে বরং অক্ষত থাক সবুজ ঘাসের সঙ্গে রাহানের টেস্ট ‘হোয়াইটস’-এর ‘প্রেম’। অক্ষত থাক, সেই আট বছরের শান্ত ছেলেটার ছবি। যে রোজ ডোম্বিভেলি থেকে মুম্বই ময়দানে লোকাল ট্রেনে করে আসত, ক্রিকেট শেখার তাড়নায়।
অভাব-অভিযোগকে বন্দি করে। বিনয়কে সঙ্গী করে!
শেয়ার
লিংক



