0%

বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বের উত্থান অনিবার্য, রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে সংস্কার জরুরি: গুতেরেস

রাষ্ট্রসঙ্ঘ, ১৩ সেপ্টেম্বর : ব্রিকস সম্মেলনে বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বের যে অনিবার্য উত্থান প্রতিফলিত হয়েছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদসহ বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলিতে সংস্কার জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রসঙ্ঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস।

নয়াদিল্লিতে ১১টি দেশের ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে গুতেরেস বলেন, বহুমেরুকেন্দ্রিকতা বিশ্বের বিভিন্ন ব্যবস্থা ও প্রতিষ্ঠানে ভারসাম্য আনতে এবং উন্নয়নের গতি বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। তবে তার জন্য বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলির সংস্কার প্রয়োজন। এর মধ্যে রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদ এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলির ব্রেটন উডস ব্যবস্থা অন্যতম।

১৯৪৫ সালের পর থেকে বিশ্বব্যবস্থায় যে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে, তা তুলে ধরতে গুতেরেস এই মাসে রাষ্ট্রসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদে অনুমোদিত ‘ইক্যুয়াল আর্থ’ মানচিত্রের প্রসঙ্গও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এতদিন ব্যবহৃত মার্কেটর প্রজেকশন বিশ্বের একটি বিকৃত চিত্র তুলে ধরত। এতে কিছু অঞ্চলকে তুলনামূলকভাবে বড় এবং অন্য অঞ্চলকে ছোট করে দেখানো হতো। নতুন মানচিত্র বর্তমান বিশ্বের বাস্তব চিত্রকে আরও সঠিকভাবে তুলে ধরেছে। বিশ্বের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকেও একইভাবে বর্তমান বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটাতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

গুতেরেস বলেন, বিশ্ব যখন অনিবার্যভাবে বহুমেরুকেন্দ্রিক ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন সমস্ত দেশকে এমন একটি বহুপাক্ষিক ব্যবস্থা শক্তিশালী ও সুরক্ষিত করার জন্য কাজ করতে হবে, যা সকলের জন্য কার্যকর হয়। ব্রিকস সম্মেলনের মূল ভাবনা অনুযায়ী স্থিতিস্থাপকতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা এবং স্থায়িত্বের ওপর জোর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

বিশ্বব্যাপী অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের জন্য চারটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রের কথাও তুলে ধরেন রাষ্ট্রসঙ্ঘের মহাসচিব। এগুলি হল অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জলবায়ু ন্যায়বিচার এবং শান্তি।

গুতেরেস বলেন, বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাঙ্কগুলিকে আরও বড়, উন্নত এবং কার্যকর হতে হবে। বিপুল পরিমাণ বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং উন্নয়নশীল দেশগুলির জন্য সহজ শর্তে অর্থায়ন বাড়াতে নতুন ব্যবসায়িক মডেল প্রয়োজন। পাশাপাশি ঋণমুক্তির জন্যও কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এআই কয়েক দশকের উন্নয়নকে কয়েক বছরের মধ্যে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু বর্তমানে এর ক্ষমতা কয়েকটি সংস্থা এবং কয়েকটি দেশের হাতে কেন্দ্রীভূত। এই বৈষম্য নিয়ন্ত্রণহীন থাকলে আয়, সুযোগ, নিরাপত্তা এবং সার্বভৌমত্বের ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিভাজন আরও বাড়বে বলে সতর্ক করেন তিনি।

ব্রিকস দেশগুলির মধ্যে প্রতিভা, ধারণা এবং বিপুল পরিসর থাকলেও অনেক দেশের কাছে পর্যাপ্ত কম্পিউটিং ক্ষমতা ও তথ্যভাণ্ডার নেই বলেও উল্লেখ করেন গুতেরেস।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রসঙ্গে তিনি বিশ্ব উষ্ণায়নের বিরুদ্ধে আরও জোরালো পদক্ষেপের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, অত্যন্ত শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতি তীব্র তাপপ্রবাহ, হিমবাহের দ্রুত গলন, ভয়াবহ দাবানল এবং বিধ্বংসী বন্যার মতো পরিস্থিতিকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। এগুলি জলবায়ু পরিবর্তনের ভবিষ্যৎ প্রভাবেরই পূর্বাভাস।

জলবায়ু ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে উন্নত দেশগুলিকে উন্নয়নশীল দেশগুলিকে জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলায় সহায়তার জন্য বছরে ৩০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে হবে বলেও জানান তিনি।

চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে শান্তির ওপর জোর দিয়ে গুতেরেস বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চল, ইউক্রেন থেকে শুরু করে সুদানের মতো বিভিন্ন স্থানে সংঘাত অব্যাহত রয়েছে। বিশ্বের এখন শান্তি প্রয়োজন। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের অধিকার ও স্বাধীনতা এবং প্রতিটি দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।

রাষ্ট্রসঙ্ঘের মহাসচিব হিসেবে নিজের মেয়াদের শেষ পর্বে থাকা গুতেরেসের জন্য নয়াদিল্লির ব্রিকস সম্মেলন ছিল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সামনে তাঁর দীর্ঘদিনের বৈশ্বিক কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি তুলে ধরার অন্যতম শেষ বড় মঞ্চ। এই নেতারা এবং অন্যান্য ব্রিকস সদস্য দেশের নেতারা সম্মিলিতভাবে বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেন।

—আইএএনএস

Related Articles

Back to top button

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker