0%

মুসলিম শরণার্থীরাই জ্বালিয়েছে প্যারিস! ‘ফরাসি বিপ্লবে’ লাভের গুড় খাচ্ছেন ‘দক্ষিণপন্থী’ লি পেন

১ মাসেরও বেশি সময় ধরে জ্বলছে ফ্রান্স। শিক্ষা, পরিকাঠামো, মুদ্রাস্ফীতি, বাসস্থান সংকট ও উন্নয়নের দাবিতে ইয়েলো ভেস্টদের পাশাপাশি বিক্ষোভে যোগ দিয়েছেন পড়ুয়ারাও। ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে একের পর এক প্রাচীন স্থাপত্য। বিক্ষোভে স্লোগান উঠেছে স্বাধীন প্যালেস্টাইনের। পরিকাঠামোগত উন্নয়নের দাবিতে যে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল তা অরাজকতায় চরমে উঠেছে। বিক্ষোভ ছড়িয়েছে স্পেন, ইরালি পর্তুগালেও। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-সহ একাধিক রাষ্ট্রনেতা অভিযোগ তুলেছেন, ফ্রান্সের এই বেহাল অবস্থার নেপথ্যে রয়েছেন মুসলিম শরণার্থীরা। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ তা খারিজ করলেও অভিযোগ পুরোপুরি এড়ানো যাচ্ছে না।

রিপোর্ট বলছে, আজকের ফ্রান্সের এই বেহাল অবস্থার বীজ পোঁতা হয়েছিল ২০১৬ সালে। সেই সময় মধ্যপ্রাচ্যের সিরিয়া, মরক্কো, উগান্ডার মতো দেশগুলিতে যুদ্ধ পরিস্থিতির জেরে লাখ লাখ উদ্বাস্তু ভিড় জমাতে শুরু করে ইউরোপে। ফ্রান্সে ফরাসি লিবারেল এবং বামপন্থী দলগুলির তরফে স্লোগান দেওয়া হয় ‘রিফিউজিস ওয়েলকাম’। শরণার্থীদের স্বাগত জানানোর মানবিক আন্দোলন তীব্র রূপ নেয়। অন্যদিকে রাজনৈতিক মতভেদও শুরু হয় ব্যাপকভাবে। ওই বছরই দেশের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন লিবারেল নেতা এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। তিনি শরণার্থীদের ‘অর্থনৈতিক ও সামাজিক শক্তি’ হিসেবে বর্ণনা করেন এবং জার্মানির উন্মুক্ত শরণার্থী নীতির প্রশংসা করেন।

বিক্ষোভকারীদের তরফে স্লোগান উঠেছে, ‘বিসমিল্লাহ সেস লে তেনেব্রে’। যার অর্থ, ‘ঈশ্বরের নামে এই অন্ধকারের বিরুদ্ধে আমরা লড়াই চালিয়ে যাব।’

এর পরবর্তী গল্প পরিষ্কার। শরণার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হয় ফ্রান্সের সীমান্ত। লক্ষ লক্ষ শরণার্থী ভিড় জমান দেশটিতে। শুরুতে তাঁদের সহজভাবে গ্রহণ করা হলেও সমস্যা শুরু হয় ধাপে ধাপে। শরণার্থীর চাপ বাড়ায় পরিষেবা ক্ষেত্রে সমস্যা বাড়তে থাকে। অর্থনীতির উপর চাপ বাড়ার পাশাপাশি বাসস্থান সংকট চরম আকার নেয়। ধীরে ধরে ঘুণ ধরে পরিকাঠামো ক্ষেত্রে। বিনামূল্যে শিক্ষার দেশ ফ্রান্সের স্কুলগুলির অবস্থা খারাপ হতে শুরু করে, মুদ্রাস্ফীতি চরমে ওঠে, বেড়ে যায় জ্বালানি তেলের দাম। এই বেহাল পরিস্থিতিই আজ রাস্তায় নামিয়েছে ফ্রান্সের নাগরিকদের। প্রথমে ইয়েলো ভেস্টদের দ্বারা শুরু হওয়া বিক্ষোভ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে ছাত্র ও যুবসমাজের মধ্যে। অভিযোগ, এই বিদ্রোহেই ঢুকে পড়েছে মুসলিম শরণার্থীরা। শুরু হয়েছে ব্যাপক ভাঙচুর ও হিংসা। হিজাব পরে হাজার হাজার মহিলা যোগ দেন এই আন্দোলনে। আগুন ধরানো হয় একের পর এক স্থাপত্যে। মুসলিম এলাকাগুলিতে ইহুদিদের উপর হামলার ঘটনা ঘটে। হাজার হাজার দোকান বাড়িতে চলছে বেলাগাম লুটপাট। গুরুতর এই পরিস্থিতিতেও বিক্ষোভ থামাতে বিশেষ কোনও উদ্যোগ নেননি ম্যাক্রোঁ প্রশাসন। অভিযোগ ওঠে, শক্ত হাতে বিক্ষোভ থামানোর পরিবর্তে ফরাসি পুলিশের হাত-পা বেঁধে দিয়েছেন তিনি। বিক্ষোভকারীদের তরফে স্লোগান উঠেছে, ‘বিসমিল্লাহ সেস লে তেনেব্রে’। যার অর্থ, ‘ঈশ্বরের নামে এই অন্ধকারের বিরুদ্ধে আমরা লড়াই চালিয়ে যাব।’

বিক্ষোভকারীদের তরফে স্লোগান উঠেছে, ‘বিসমিল্লাহ সেস লে তেনেব্রে’।

দেশের এই বেহাল পরিস্থিতির জন্য প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁকে দুষেছেন ফ্রান্সের ডানপন্থী দল ‘ন্যাশনাল র‍্যালি’র নেত্রী মেরি লি পেন। ২০২৭ সালে ফ্রান্সে হতে চলা নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী লি পেন গোটা ঘটনার জন্য উদ্বাস্তু নীতিকে দায়ী করেছেন। পাশাপাশি যা চলছে তা গণতন্ত্রের জন্য হুমকি বলে বর্ণনা করেন লি পেন। তিনি বলেন, ”ম্যাক্রোঁ ও তাঁর সরকার গোটা পরিস্থিতির উপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে। লক্ষ্যহীনভাবে চলছে এই সরকার। এদের কোনও বিশ্বাসযোগ্যতা নেই। কড়া হাতে পরিস্থিতির মোকাবিলা না করলে ফল আরও গুরুতর হতে পারে।”

জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে ফ্রান্সের ঐতিহাসিক লিমোগেজ টাউন হল।

এদিকে ওয়াকিবহাল মহলের মতে, ম্যাক্রোঁ নিজের ঘাড় থেকে দায় যতই ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করুন না কেন, তাঁর উদ্বাস্তু নীতির জেরেই পরিস্থিতি যে এতটা গুরুতর আকার নিয়েছে তা অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই। এই উদ্বাস্তুদের ভোটকে হাতিয়ার করে এতদিন ফ্রান্সের ক্ষমতায় বসেছিলেন ম্যাক্রোঁ। এই বিক্ষোভের পর ফ্রান্সের সাধারণ জনতা এখন লি পেন মুখী। গত জানুয়ারি মাসে ফ্রান্সে হওয়া নির্বাচনে ৩০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছেন তিনি। আগামী বছর ফ্রান্সের নির্বাচনে ডানপন্থী এই নেত্রীর জয়ের সম্ভাবনা ক্রমশ বাড়ছে। অন্যদিকে, লি পেন ক্ষমতায় এলে ফ্রান্সে শরণার্থী নীতিতে আমূল বদল আসতে পারে। সেক্ষেত্রে ফ্রান্সের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে কি না তা সময়ই বলবে।

শেয়ার

লিংক

Related Articles

Back to top button

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker