0%

শাল-পিয়াল-মহুয়ার সঙ্গে ইতিহাসের টান, কলকাতার কাছের এই জায়গাটিতে পাড়ি জমাবেন নাকি?

ঘন জঙ্গলের ভিতরে পেভার ব্লকের রাস্তা। পর্যটকদের যাতায়াত সুগম করেছে এই রাস্তা। গলসি বিধানসভার অন্যতম পর্যটনস্থল ফিরে পেয়েছে তার আপন গরিমা। রাঢ় বাংলার কাঁকসার গড় জঙ্গলে লালমাটির দেশ। শাল, পিয়াল, মহুয়া-সহ নানা নাম না জানা বৃক্ষের ঘন জঙ্গল আর ইতিহাস লোককথায় মোড়া কাঁকসার বনকাটি। বহু শতাব্দী ধরেই বহন করে চলেছে অতীতের স্মৃতি। জঙ্গলের গভীরে অবস্থিত শ্যামরূপা মন্দির বহু যুগ ধরে স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস, ভক্তি ও আধ্যাত্মিক সাধনার কেন্দ্রস্থল। জনশ্রুতি বলে, দেবী শ্যামরূপা এই অরণ্যভূমির অধিষ্ঠাত্রী শক্তি, যাঁর কৃপায় এই অঞ্চল রক্ষা পেয়েছে বহু বিপদ থেকে। এখানেই আবার রয়েছে ঐতিহাসিক পর্যটনস্থল দেউল। তাই ইছাই ঘোষের দেউল ও শ্যামরূপা মন্দির দুটি স্থানই ইতিহাস, ধর্ম ও সংস্কৃতির এক অনন্য যুগলবন্দি। কিন্তু এত ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলের প্রধান সমস্যা ছিল যোগাযোগ ব্যবস্থা।

গলসি বিধানসভার বনকাটি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকা থেকে দেউল হয়ে শ্যামরূপা মন্দির পর্যন্ত রাস্তা ছিল অত্যন্ত দুর্গম। ভাঙাচোরা মোরাম মাটির পথ, কাঁচা রাস্তা, বর্ষায় কাদা আর গ্রীষ্মে ধুলোর দাপটে সাধারণ মানুষ, ভক্ত, পর্যটক এমনকি গবেষকদেরও যাতায়াতে চরম সমস্যার মুখে পড়তে হতো। বহু মানুষ ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও এই ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় স্থান পরিদর্শনে নিরুৎসাহিত হতেন। ফলে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও পর্যটন বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল। রাস্তা নিয়ে বন বিভাগের সঙ্গে বিস্তর আলোচনা, চিঠি চালাচালির পরও পাকা রাস্তা তৈরির অনুমতি মেলেনি। তবে ইটের রাস্তার অনুমতি দেয় বন বিভাগ। ২০২৬ সালের ১ মার্চ সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটল। রাজা ইছাই ঘোষের দেউল থেকে শ্যামরূপা মন্দির পর্যন্ত নতুন সড়কের উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে খুলে গেল উন্নয়নের এক নতুন দরজা। ১০ কোটি টাকা ব্যয় করে রাজ্য পঞ্চায়েত ও গ্রাম উন্নয়ন দপ্তরের অর্থানুকুল্যে তৈরি হয় এই রাস্তা।

Kulti-2
জঙ্গলের গভীরে অবস্থিত শ্যামরূপা মন্দির বহু যুগ ধরে স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস, ভক্তি ও আধ্যাত্মিক সাধনার কেন্দ্রস্থল

এখন বনকাটি থেকে দেউল এবং সেখান থেকে শ্যামরূপা মন্দিরে পৌঁছনো অনেক সহজ, নিরাপদ ও আরামদায়ক। নতুন রাস্তা চালু হওয়ার ফলে ইতিমধ্যেই এলাকায় পর্যটকদের সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। আগে যেখানে কেবল বিশেষ উৎসব বা স্থানীয় ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সময় কিছু মানুষের আনাগোনা দেখা যেত, এখন সারা বছরই ইতিহাসপ্রেমী, ভ্রমণপিপাসু, গবেষক ও সাধারণ দর্শনার্থীদের আগ্রহ বাড়ছে। বিশেষ করে রাজা ইছাই ঘোষের ঐতিহাসিক পরিচয়, শ্যামরূপা দেবীর মাহাত্ম্য এবং জঙ্গলঘেরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মিলিয়ে এই অঞ্চল ধীরে ধীরে ধর্মীয়-ঐতিহ্য পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ মানচিত্রে উঠে আসছে। পর্যটনের প্রসার স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। পর্যটকদের আনাগোনা বাড়লে হোটেল, লজ, গাইড পরিষেবা, স্থানীয় পরিবহণ সব বাড়তি গুরুত্ব পাবে।

স্থানীয়দের মতে, ইছাই ঘোষের দেউল, শ্যামরূপা মন্দির এবং পার্শ্ববর্তী বনাঞ্চলকে কেন্দ্র করে একটি পূর্ণাঙ্গ ফরেস্ট হেরিটেজ-ট্যুরিজম সার্কিট গড়ে তোলা সম্ভব। শ্যামরূপা মন্দিরের সেবাইত ভূতনাথ রায় বলেন, “আমরা কোনদিন ভাবতেই পারিনি এই রাস্তা হবে। এই সরকারের আমলে হয়েছে। রাজ্যের বিদায়ী পঞ্চায়েত গ্রামোন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রীর হাত ধরে। দেউল থেকে শ্যামরূপা মন্দির যেতে দীর্ঘ সময় লাগতো। দুর্ঘটনার কবলে পড়তে হত। কিন্তু বর্তমানে চরম সুবিধা হয়েছে। পর্যটকদের আনাগোনা বেড়েছে এবং ভক্তদের আগমন বাড়ছে।”

শেয়ার

লিংক

Related Articles

Back to top button

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker