পিচের মাটিও ‘বেআইনি’ভাবে আমদানি! ‘অথরাইজড ডিলারে’র থেকে মাটি না কিনে বিতর্কে সিএবি

লোধা আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মেয়াদ শেষের পরেও সিএবি কর্তা মদন ঘোষের লম্বা সময় প্রশাসনিক পদে বহাল থাকা (কিছুদিন পূর্বে সরেছেন)। যোগ্যতম হওয়া সত্ত্বেও, বাংলা কোচিং গ্রুপ থেকে সৌরাশিস লাহিড়ীকে বাদ দিয়ে দেওয়া। বোর্ড নির্দেশিকায় আধার কার্ড আপডেট হিস্ট্রি চেক করতে শ’য়ে-শ’য়ে ক্রিকেটারের বাদ পড়া। যাঁরা বাংলার ক্রিকেটার কি না, ঘোর প্রশ্ন।
তিনটে উদাহরণ উপরে দেওয়া হল মাত্র। কিন্তু বিগত কয়েক মাসে সিএবির নানাবিধ বিতর্কে জড়ানোর আরও প্রচুর উদাহরণ রয়েছে। মঙ্গলবার নতুন বিতর্কে অগ্নি-সংযোগ ঘটল। যার নেপথ্যে, মাটি।
পিচের মাটি!
ময়দানের বিভিন্ন ক্লাবকে পিচ তৈরির জন্য মাটি সরবরাহ করে সিএবি। যাতে পিচ তৈরিতে কোনও বৈষম্য না থাকে। সব মাঠের পিচ যাতে সমমানের হয়। ইডেন গার্ডেন্সের পিচ তৈরির মাটি আসে সাধারণত তারকেশ্বর থেকে। আর বাদবাকি মাঠের পিচের মাটি আসে, শাসন-বসিরহাট থেকে। কে জানত, এ বার সেই মাটি সরবরাহকে ঘিরে এমন বিতর্ক সৃষ্টি হবে? কে জানত, সিএবির মাটি আমদানি-প্রক্রিয়ার যা পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ বেরাবে, তাকে এক প্রকার ‘বেআইনি’ অ্যাখ্যা দেওয়া যায়! সিএবি নাকি আজ পর্যন্ত কোনও ‘অথরাইজড ডিলার’ থেকে মাটিই কেনেনি! যার থেকে মাটি নেওয়া হত, সেই ভদ্রলোক নাকি ‘অথরাইজড ডিলার’-ই নন!
সিএবি যে সমস্ত জেনেশুনে তা করত, এমন নয়। অনেকেরই ধারণা, ‘অজ্ঞতার’ কারণে দীর্ঘদিন এ জিনিস চলে এসেছে। পূর্বতন গ্রাউন্ডস কমিটির চেয়ারম্যান মদন ঘোষের আমলে হয়েছে। বর্তমান গ্রাউন্ডস কমিটি প্রধান অমিতাভ আঢ্য-র আমলেও তা বদলায়নি।
শোনা গেল, মাটি নিয়ে লরি আসার সময় সরকারি কড়াকড়ির কারণে পুরো ব্যাপারটা জানাজানি হয়। যথাযথ ‘চালান’ না থাকায় সে লরিকে ফেরত পাঠায় পুলিশ। সিএবিতেও পিচ তৈরির মাটি যে কারণে এসে পৌঁছতে পারেনি। সিএবি কর্তারা এরপর পুরো বিষয়টা জানতে পারেন। ওয়াকিবহাল মহলের খবর অনুযায়ী, সিএবি সচিব বাবলু কোলে গ্রাউন্ডস কমিটি চেয়ারম্যান অমিতাভ আঢ্য এবং আম্পায়ার্স কমিটির চেয়ারম্যান প্রসেনজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়কে পাঠান উত্তর চব্বিশ পরগনার জেলাশাসকের দফতরে গিয়ে কথাবার্তা বলতে। ব্যাপারটার সুরাহা করতে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, সেই বৈঠকেই ‘ফাঁস’ হয় যে, মাটি সরবরাহের জন্য যে বারো জন ‘অথরাইজড ডিলার’ রয়েছেন, তাঁদের কারও থেকেই পিচ তৈরির মাটি কেনে না সিএবি! তখন নাকি ডেকে পাঠানো হয় নুরুল নামের সেই ব্যক্তিকে, যাঁর কাছ থেকে মাটি কেনে সিএবি। তা, সেই ব্যক্তি নাকি জেলাশাসকের দফতরে অকপটে স্বীকার করেন যে, ‘অথরাইজড ডিলার’ তিনি নন। পুলিশকে ‘উৎকোচ’ দিয়ে নাকি এত দিন মাটি নিয়ে আসতেন! রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পর যা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গিয়েছে। যথাযথ ‘চালান’ না থাকায় পুলিশ মাটি-ভর্তি লরিকে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে।
সিএবিতে তোলপাড় পড়ে গিয়েছে এ নিয়ে। শোনা গেল, এবারের মতো সমস্যা সমাধানের রাস্তা বার করার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু স্পষ্ট বলে দেওয়া হয়েছে, আগামী বার থেকে নির্ধারিত বারো জন ‘অথরাইজড ডিলার’-এর থেকেই মাটি নিতে হবে। যথাযথ ‘টেন্ডার’ ডেকে। শোনা গেল, সিএবি সেই প্রক্রিয়াও চালু করে দিচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন একটাই। বছরের পর বছর ধরে এ জিনিস চলে এল কী করে?
মাটি নিয়ে লরি আসার সময় সরকারি কড়াকড়ির কারণে পুরো ব্যাপারটা জানাজানি হয়। যথাযথ ‘চালান’ না থাকায় সে লরিকে ফেরত পাঠায় পুলিশ। সিএবিতেও পিচ তৈরির মাটি যে কারণে এসে পৌঁছতে পারেনি।
সবচেয়ে আশ্চর্যজনক–সিএবির গ্রাউন্ডস কমিটির চেয়ারম্যান অমিতাভ আঢ্য-র ভূমিকা এবং ‘পলায়ন-মূলক’ আচরণ! প্রথমত, পুরো প্রক্রিয়া দেখার দায়িত্ব তাঁর। পিচের মাটি কোথা থেকে কে সরবরাহ করছে, সে ‘অথরাইজড ডিলার’ কি না, দেখা তাঁর দায়। দ্বিতীয়ত, মানুষ মাত্রে ভুল হতেই পারে। গুরুত্বপূর্ণ হল, সেই ভুলকে স্বীকার করে সেটাকে ঠিক করা। কিন্তু মঙ্গলবার সন্ধেয় পুরো ঘটনা নিয়ে সিএবি গ্রাউন্ডস কমিটি প্রধান অমিতাভকে ফোন করায়, তিনি ‘উদ্ধত’ ভাবে বারবার বলে গেলেন, পিচের মাটি সরবরাহ নিয়ে নাকি কোনও সমস্যাই হয়নি!
পাল্টা তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হল, সিএবি কি ‘অথরাইজড ডিলার’-এর থেকে মাটি কিনেছে? উত্তরে অমিতাভ বললেন, “হ্যাঁ। অথরাইজড ডিলারের থেকেই কেনা হয়।’’ এবার সেই ‘অথরাইজড ডিলার’-এর নাম জিজ্ঞাসা করায়, তিনি কিছুতেই তা বলতে চাইলেন না! ‘অখণ্ড নীরবতা’ শেষে উল্টে বললেন, ‘‘আমি জানি সেই অথরাইজড ডিলারের নাম। কিন্তু আপনাকে বলব কেন? তা জানতে গেলে, সিএবিতে এসে কথা বলতে হবে। এ ভাবে কথা হয় না।”
মঙ্গলবার সন্ধেয় পুরো ঘটনা নিয়ে সিএবি গ্রাউন্ডস কমিটি প্রধান অমিতাভকে ফোন করায়, তিনি ‘উদ্ধত’ ভাবে বারবার বলে গেলেন, পিচের মাটি সরবরাহ নিয়ে নাকি কোনও সমস্যাই হয়নি!
যুক্তি হিসেবে, যা চরম হাস্যকর। পরে প্রসেনজিতকে (অমিতাভ-র সঙ্গে জেলাশাসকের দফতরে গিয়েছিলেন যিনি) জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, “আমি এ নিয়ে মন্তব্য করতে বাধ্য নই।” বোঝা গেল। কিন্তু ওয়াকিবহাল মহল বলছে, অমিতাভ-র এ ভাবে শাক দিয়ে মাছ ঢাকার অর্থ কী? সিএবি গ্রাউন্ডস কমিটি চেয়ারম্যান যদি ‘অথরাইজড ডিলার’-এর নাম জেনেই থাকেন, বলতে কী অসুবিধে ছিল? সিএবিতে গিয়ে খোঁজ করলে, সে নাম কি বদলে যেত? বরং স্থানীয় ক্রিকেটমহলের বিনীত একটা প্রশ্ন রয়েছে সিএবি গ্রাউন্ডস কমিটি প্রধানের কাছে–কিছু যদি না-ই হয়ে থাকবে, তা হলে প্রসেনজিতকে নিয়ে জেলাশাসকের দফতরে তিনি গিয়েছিলেন কেন? কোন অভিলাষে?
চা-বিস্কুট খেতে?
শেয়ার
লিংক



