তিস্তা প্রকল্পে কেন বাংলাদেশকে সাহায্য করছে চিন? নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করল বেজিং

বাংলাহান্ট ডেস্ক: তিস্তা ঘিরে বাংলাদেশ ও চিনের (China) মধ্যে যে সাম্প্রতিক সময়ে বেশ চর্চা চলেই আসছে। তিস্তাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা নতুন করে দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক সমীকরণে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। এবার এই ইস্যুতে সরাসরি নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করল বেজিং। সম্প্রতি বাংলাদেশের (Bangladesh) প্রধান তারেক রহমান চিন সফরে যান। এরপরই চিনের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র গুয়ো জিয়াকুন জানিয়েছেন, তিস্তা প্রকল্পে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করলেও সেই সহযোগিতার ফলে কোনও তৃতীয় পক্ষের কোনওরকম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াবে না। একই সঙ্গে তিনি এও স্পষ্ট করেছেন যে, বাংলাদেশ ও চিনের পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে কোনও তৃতীয় দেশের কোনও প্রভাবও খাটবে না। বেজিংয়ে এক সাংবাদিক বৈঠকে তিস্তা প্রকল্প নিয়ে প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, তিস্তার সার্বিক উন্নয়ন ও সংস্কার বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জনকল্যাণমূলক প্রকল্প। সেই কারণে এই প্রকল্পে চিন তার সামর্থ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চ সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। তাঁর দাবি, বাংলাদেশের এই উন্নয়ন পরিকল্পনায় আরও সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে চায় চিন এবং অর্থনীতি, বাণিজ্য, জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের মতো ক্ষেত্রেও দুই দেশের সহযোগিতা আরও গভীর হবে।
তিস্তা প্রকল্পে কেন বাংলাদেশকে সাহায্য করছে চিন (China)?
চিনের (China) এই অবস্থান সামনে আসার পর তিস্তা প্রকল্প ঘিরে নতুন করে কূটনৈতিক জল্পনা শুরু হয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের নতুন সরকারের বিদেশমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে চিনের বিদেশমন্ত্রী ওয়াং ই-র বৈঠকে তিস্তা প্রকল্প ছিল অন্যতম আলোচ্য বিষয়। শুধু তাই নয়, গত সপ্তাহে তিন দিনের সফরে চিনে গিয়েছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেই সফরে চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তাঁর বৈঠকেও তিস্তা প্রকল্প নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে কূটনৈতিক মহলের ধারণা। যদিও এই বিষয়ে এখনও পর্যন্ত কোনও আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি বেজিং বা ঢাকা। তবে দুই দেশের সাম্প্রতিক যোগাযোগ এবং বারবার তিস্তা প্রসঙ্গ উঠে আসা থেকে স্পষ্ট, নদী ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামো উন্নয়নের এই প্রকল্পকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে উভয় দেশ।
আরও পড়ুন: আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ভারতের মাস্টারস্ট্রোক! খামেনেইয়ের শেষকৃত্যে মোদীর পরিবর্তে ইরানে যাচ্ছেন কারা?
বাংলাদেশের প্রস্তাবিত এই পরিকল্পনার নাম ‘কম্প্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন অফ তিস্তা রিভার প্রজেক্ট’। এর আওতায় প্রায় ১০২ কিলোমিটার নদীখাত খনন করে তিস্তার গভীরতা বৃদ্ধি, নদীর দুই তীরে মোট ২০৩ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধ নির্মাণ, ভাঙন রোধ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং সেচ ব্যবস্থার উন্নয়নের মতো একাধিক কাজের পরিকল্পনা রয়েছে। সম্প্রতি খলিলুর রহমান জানিয়েছেন, এই প্রকল্পের প্রযুক্তিগত ও প্রকৌশলগত দিকগুলি যৌথভাবে খতিয়ে দেখবেন বাংলাদেশ ও চিনের বিশেষজ্ঞরা। ফলে ভবিষ্যতে চিনের সক্রিয় অংশগ্রহণের সম্ভাবনা আরও জোরালো হয়েছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বাংলাদেশের দাবি, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের কৃষি, নদী ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
তবে এই পুরো বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ভারত। নয়াদিল্লির মতে, তিস্তা প্রকল্পে চিনের অংশগ্রহণ শুধু একটি অবকাঠামোগত সহযোগিতার বিষয় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূ-কৌশলগত প্রশ্নও। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, যদি চিন এই প্রকল্পে বড় ভূমিকা নেয়, তাহলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিলিগুড়ি করিডরের খুব কাছাকাছি তাদের উপস্থিতি তৈরি হতে পারে। এই কারণেই দীর্ঘদিন ধরেই তিস্তা প্রকল্পে চিনের আগ্রহকে সতর্ক দৃষ্টিতে দেখে আসছে ভারত। নয়াদিল্লির আশঙ্কা, উন্নয়ন প্রকল্পের আড়ালে ভবিষ্যতে এই অঞ্চলে চিনের কৌশলগত প্রভাব আরও বৃদ্ধি পেতে পারে, যা ভারতের নিরাপত্তা-স্বার্থের পক্ষে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

আরও পড়ুন: তৃণমূলের ৪৪০ কোটির ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট বিতর্কে নতুন মোড়! কী জানাল কলকাতা হাই কোর্ট?
প্রসঙ্গত, তিস্তা প্রকল্প নিয়ে বাংলাদেশকে সহযোগিতার আগ্রহ শুধুমাত্র যে চিনই (China) দেখিয়েছে তা কিন্তু নয়। ২০২৪ সালে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নয়াদিল্লি সফরের সময় ভারতও তিস্তার সংরক্ষণ, নদী ব্যবস্থাপনা এবং প্রকৌশলগত সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছিল। এমনকি তিস্তা মহাসেচ প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব ভারতকে দেওয়ার সিদ্ধান্তও নিয়েছিল হাসিনা সরকার। কিন্তু পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে সেই পরিকল্পনা আর বাস্তবায়নের পথে এগোয়নি। এখন বাংলাদেশের নতুন সরকারের আমলে চিনের সক্রিয়তা বাড়ায় তিস্তা আবারও দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। উন্নয়ন, জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা—এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করেই আগামী দিনে তিস্তা প্রকল্পকে ঘিরে ভারত, বাংলাদেশ ও চিনের কৌশলগত অবস্থান আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে বলেই মনে করছে আন্তর্জাতিক মহল।




