‘সংসদ চলো’ মিছিলে উত্তাল দিল্লি, পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ! আলোচনার মধ্যেই বাড়ল উত্তেজনা – সবদিক

খবর অনলাইন ডেস্ক: সোমবার দেশের রাজধানী নয়াদিল্লিতে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় যুব-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের সাক্ষী থাকল দেশ। সিজেপি-র ডাকে আয়োজিত ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচিতে যোগ দিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী, নিট-সহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া পরীক্ষার্থী, সমাজকর্মী, অভিভাবক এবং তরুণ পেশাজীবীরা রাজধানীতে জড়ো হন।
সকাল থেকেই রাজধানীর কেন্দ্রস্থল কার্যত দুর্গে পরিণত হয়েছিল। যন্তর মন্তর এবং সংসদ ভবন সংলগ্ন একাধিক মেট্রো স্টেশন বন্ধ করে দেওয়া হয়। নতুন দিল্লির বিস্তীর্ণ এলাকায় ইন্টারনেট পরিষেবাও সাময়িক ভাবে বন্ধ রাখা হয়। সংসদ ভবনের আশপাশে বহুস্তরীয় ব্যারিকেড বসানো হয় এবং দিল্লি পুলিশ ও র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স (আরএএফ)-এর হাজার হাজার জওয়ান মোতায়েন করা হয়।
– বিজ্ঞাপন –
কিন্তু কড়া নিরাপত্তা সত্ত্বেও আন্দোলনকারীদের ঢল থামেনি। ব্যাকপ্যাক কাঁধে ছাত্রছাত্রী থেকে শুরু করে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার্থীরা, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা এবং বিভিন্ন পেশার মানুষ যন্তর মন্তরে এসে জড়ো হন।
নাড্ডার সঙ্গে বৈঠক সিজেপি-র প্রতিনিধিদের
এ দিকে, আন্দোলন শুরুর পর এই প্রথম কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন সিজেপি নেতারা। সংগঠনের মুখপাত্র আশুতোষ রানকা এবং সৌরভ দাসের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জগৎ প্রকাশ নাড্ডার বাসভবনে গিয়ে তাঁর সঙ্গে বৈঠক করেন। যন্তর মন্তরে উপস্থিত আন্দোলনকারীদের মধ্যে তখন আশার সঞ্চার হয়েছিল যে, আলোচনার পাশাপাশি সংসদ অভিযানের কর্মসূচিও চলতে পারে।
তবে সেই আশাবাদ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। সিজেপি-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে যখন আন্দোলনকারীদের সংসদের দিকে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান, তখন তাঁর সঙ্গে ছিলেন অভিনেতা-সমাজকর্মী প্রকাশ রাজ, অভিনেত্রী শাবানা আজমি এবং সংগঠনের অন্যান্য সদস্য ও রাজনৈতিক নেতারা।
মিছিল সংসদের দিকে এগোতেই আন্দোলনকারীরা চারদিক থেকে পুলিশের ব্যারিকেডে আটকে পড়েন। পার্লামেন্ট স্ট্রিট, জনপথ এবং রাইসিনা রোড-সহ সংসদ ভবনের দিকে যাওয়ার সমস্ত প্রধান রাস্তা ব্যারিকেড দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়। বিভিন্ন দিক থেকে নিরাপত্তারক্ষীরা আন্দোলনকারীদের অগ্রগতি রুখে দেন।
বিজ্ঞাপন
দফায় দফায় সংঘর্ষ, পুলিশের লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, তাঁরা সামনে এগোতে পারছিলেন না, আবার সহজে আন্দোলনস্থল ছেড়েও বেরিয়ে যেতে পারছিলেন না। কয়েক মিনিটের মধ্যেই প্রথম সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। তার পর সারা দিন ধরে একই চিত্র বারবার দেখা যায়। কখনও জনতা ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা করেছেন, কখনও পুলিশ লাঠিচার্জ করেছে, আবার কোথাও কাঁদানে গ্যাসের শেল ফাটানো হয়েছে।
পার্লামেন্ট স্ট্রিট থেকে রাইসিনা রোড এবং কনট প্লেস পর্যন্ত একাধিক জায়গায় পদপিষ্ট হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। জনতার চাপ এবং একের পর এক পুলিশি ব্যারিকেডের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। আন্দোলনকারীদের এক জায়গা থেকে সরিয়ে দেওয়া হলেও, তাঁরা অন্য রাস্তায় গিয়ে আবার পুলিশের মুখোমুখি হন।
এই বিশৃঙ্খলার মধ্যে বহু মানুষ শ্বাসকষ্টে ভুগতে শুরু করেন, কয়েক জন অজ্ঞান হয়ে পড়েন এবং অনেককে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে যেতে হয়। প্রবীণ ও তরুণ আন্দোলনকারীদের অনেকে রাস্তার ডিভাইডারে উঠে কিংবা সরু গলিপথ দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
জনপথ এলাকার কয়েক জন ব্যবসায়ী পরিস্থিতির অবনতি দেখে তড়িঘড়ি নিজেদের দোকান বন্ধ করে দেন। তবে কিছু দোকানদার আতঙ্কিত আন্দোলনকারীদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য নিজেদের দোকানের দরজা খুলে দেন।
তবে সংঘর্ষের ঘটনায় শুধু পুলিশি পদক্ষেপই ছিল না। রিগ্যাল সিনেমা সংলগ্ন এলাকায় এক অজ্ঞাতপরিচয় আন্দোলনকারীকে রাস্তা থেকে পাথর তুলে পুলিশকর্মীদের দিকে ছুড়ে মারতে দেখা যায়।
কেন তিনি এই ধরনের সহিংসতার পথ বেছে নিয়েছেন, জানতে চাইলে ওই আন্দোলনকারী বলেন, “ওরা আমার বন্ধুকে মেরে ফেলার উদ্দেশ্যে নির্মমভাবে মারছিল। যেখানে পাচ্ছে, আমাদের মারছে। ওরা যদি আমাদের জোরে আঘাত করে, তা হলে আমরাও আরও জোরে পাল্টা আঘাত করব।”
পুলিশের দাবি, সীমিত বলপ্রয়োগ
অন্যদিকে, দিল্লি পুলিশের দাবি, আন্দোলনকারীরা যাতে নিরাপত্তা বলয় ভেঙে ফেলতে না পারেন এবং পদপিষ্ট হওয়ার মতো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, সেই কারণেই সীমিত বলপ্রয়োগ করা হয়েছে।
কিন্তু আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ যুব মিছিলে পুলিশ বারবার অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেছে। পাশাপাশি, সংবাদ সংগ্রহের সময় প্রেস পরিচয়পত্র দেখানোর পরেও কয়েক জন সাংবাদিক পুলিশের আঘাতের শিকার হয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
দিপকে-র অনশন প্রত্যাহার, সোনম চালাচ্ছেন
এই সংঘাতের আবহেই রাজনৈতিক তৎপরতাও চলতে থাকে। একদিকে সিজেপি প্রতিনিধিরা কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জগৎ প্রকাশ নাড্ডার সঙ্গে বৈঠক করেন, অন্যদিকে সোনম ওয়াংচুকের অনুরোধে অভিজিৎ দিপকে তাঁর ২৩ দিনের অনশন প্রত্যাহার করেন।
তবে সোনম ওয়াংচুক নিজে সফদরজং হাসপাতালে থেকে অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন। আন্দোলনে যোগ দেওয়ার জন্য তাঁকে অল্প সময়ের জন্য হাসপাতাল ছাড়ার অনুমতি দেওয়ার আবেদনও জানানো হয়েছে।



