UCC-এর পথে চিন? ৫৬ জাতিগোষ্ঠীর জন্য বড় পদক্ষেপ শি জিনপিংয়ের

বাংলাহান্ট ডেস্ক: চিনেও (China) এবার UCC লাগু করতে চলেছে শি জিনপিং! এক দেশ, এক পরিচয়, এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে নতুন আইন কার্যকর করল চিন। ১ জুলাই থেকে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের (Xi Jinping) নেতৃত্বে দেশটিতে কার্যকর হয়েছে ‘এথনিক ইউনিটি অ্যান্ড প্রোগ্রেস প্রোমোশন ল’ (Ethenic Unity And Progress Promotion Law)। এই আইনের মূল উদ্দেশ্য, চিনের ৫৬টি স্বীকৃত জাতিগত গোষ্ঠীকে একটি অভিন্ন জাতীয় পরিচয়ের আওতায় আনা। সরকারের দাবি, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্য আরও জোরদার করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে আইনটি কার্যকর হওয়ার পর থেকেই আন্তর্জাতিক মহলে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা। অনেকেই এই উদ্যোগের সঙ্গে ভারতের ইউনিফর্ম সিভিল কোড (ইউসিসি)-এর তুলনা টানলেও, বিশেষজ্ঞদের মতে দুই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য, কাঠামো এবং প্রয়োগের ক্ষেত্র এক নয়। ফলে এই তুলনা নিয়ে মতভেদও রয়েছে। অন্যদিকে মানবাধিকার সংগঠনগুলির একাংশের আশঙ্কা, এই আইন চিনের জাতিগত বৈচিত্র্যের উপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
এথনিক ইউনিটি অ্যান্ড প্রোগ্রেস প্রোমোশন ল’ চালু করল চিন (China)
নতুন আইন অনুযায়ী, হান, উইঘুর, তিব্বতি, মঙ্গোল-সহ চিনের সব জাতিগত গোষ্ঠীর জন্য একই জাতীয় নীতি অনুসরণ করা হবে। সরকারের বক্তব্য, বহু ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মধ্যেও একটি শক্তিশালী জাতীয় পরিচয় গড়ে তোলাই এই আইনের লক্ষ্য। সেই কারণেই প্রশাসনিক ও সামাজিক স্তরে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে যোগাযোগ, অংশগ্রহণ এবং সমন্বয়ের উপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনকে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর আবাসন পরিকল্পনা, সামাজিক সংহতি এবং উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড আরও সমন্বিতভাবে পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বেজিংয়ের মতে, এর ফলে বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রবণতা কমবে এবং জাতীয় নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে। তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, ঐক্যের নামে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য কতটা অক্ষুণ্ণ থাকবে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়।
আরও পড়ুন: অভিষেকের সেবাশ্রয় নিয়ে ভয়ঙ্কর অভিযোগ, তদন্তে নামল স্বাস্থ্য দপ্তর
এই আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল শিক্ষাক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন। এখন থেকে চিনের সরকারি স্কুলগুলিতে ম্যান্ডারিন ভাষাকেই প্রধান শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে আরও জোরালোভাবে প্রয়োগ করা হবে। পাশাপাশি পাঠ্যক্রমে জাতীয় ঐক্য, দেশপ্রেম এবং চিনের (China) কমিউনিস্ট পার্টির ইতিহাস ও আদর্শের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। শুধু স্কুলেই নয়, জাদুঘর, গ্রন্থাগার এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানেও জাতীয় ঐক্য, রাষ্ট্রীয় ইতিহাস এবং সরকারি নীতির উপর নিয়মিত প্রদর্শনী, আলোচনা ও সেমিনারের আয়োজন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এমনকি নতুন আইনে অভিভাবকদেরও দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে তাঁদের সন্তানরা রাষ্ট্রীয় মূল্যবোধ এবং কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তোলে। সরকারের দাবি, নতুন প্রজন্মের মধ্যে জাতীয় চেতনা আরও শক্তিশালী করাই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।
আইনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, কেউ যদি জাতিগত বিভাজন উসকে দেওয়ার চেষ্টা করেন বা দেশের ঐক্য ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে কোনও কার্যকলাপে যুক্ত হন, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বেজিংয়ের মতে, জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এই বিধান অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তবে মানবাধিকার কর্মীদের একাংশের আশঙ্কা, এই আইনের বিস্তৃত ব্যাখ্যার সুযোগ থাকায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সাংস্কৃতিক অধিকারের উপর চাপ বাড়তে পারে। বিশেষ করে যেসব অঞ্চল অতীতে রাজনৈতিক সংবেদনশীল হিসেবে পরিচিত, সেখানে এই আইন আরও কঠোরভাবে প্রয়োগ হতে পারে বলেও তাঁদের আশঙ্কা।
আরও পড়ুন: ‘ইউজারনেম’ ফিচারে বাড়বে জালিয়াতি? মেটার পর টেলিগ্রাম-সিগন্যালকে নোটিস কেন্দ্রের
রাষ্ট্রসঙ্ঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলির একাংশ ইতিমধ্যেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাঁদের মতে, নতুন আইন কার্যকর হলে বিশেষ করে উইঘুর, তিব্বতি এবং মঙ্গোল জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় অনুশীলন ও ঐতিহ্য ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, একক জাতীয় পরিচয়ের উপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দিলে বহু শতাব্দীর সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য হারিয়ে যেতে পারে। যদিও চিন (China) সরকার এই অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছে। বেজিংয়ের দাবি, এই আইনের উদ্দেশ্য কোনও সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি বা ধর্মকে বিলুপ্ত করা নয়, বরং দেশের জাতীয় ঐক্য, সামাজিক সংহতি এবং নিরাপত্তাকে আরও সুদৃঢ় করা। ফলে আইনটি কার্যকর হওয়ার পর বাস্তবে এর প্রভাব কী হয় এবং আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ কতটা সত্যি প্রমাণিত হয়, সেদিকেই এখন নজর রয়েছে।



