0%

ক্যানসারের ৫৪৩ ওষুধের দাম কমল, চিকিৎসা মাঝপথে বন্ধের আশঙ্কা কমবে?

কলকাতা: ক্যানসারের চিকিৎসায় বড় স্বস্তি (Cancer Drug Price) পেতে পারেন বহু রোগী। আর্থিক সমস্যার কারণে যাঁদের চিকিৎসা মাঝপথে বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাঁদের জন্য নতুন করে আশার আলো দেখছেন কলকাতার ক্যানসার বিশেষজ্ঞরা। National Pharmaceutical Pricing Authority (NPPA) দেশে ৫৪৩টি ক্যানসার ওষুধের ব্র্যান্ড ও প্যাক সাইজের সর্বোচ্চ খুচরো মূল্য বা MRP সংশোধন করেছে। নির্বাচিত কিছু জেনেরিক ও বায়োসিমিলার ওষুধের দাম সর্বোচ্চ ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো হয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, ওষুধের খরচ কমলে অনেক রোগীর পক্ষে নিয়মিত চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া সহজ হবে।

কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গে ক্যানসার চিকিৎসা মাঝপথে ছেড়ে দেওয়ার সমস্যা দীর্ঘদিনের। চিকিৎসকদের বক্তব্য, চিকিৎসার বিপুল খরচ বহন করতে না পেরে অনেক পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে। উন্নত পর্যায়ের ক্যানসার চিকিৎসায় বছরে গড়ে ৩.৩ লক্ষ টাকারও বেশি ব্যক্তিগত খরচ হতে পারে। ফলে অনেক রোগী চিকিৎসার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারেন না। যদিও দেশ বা রাজ্যজুড়ে চিকিৎসা ছেড়ে দেওয়া রোগীর সুনির্দিষ্ট মোট সংখ্যা এখনও পাওয়া যায়নি।

প্রথম কেমোথেরাপির পরেই চিকিৎসা ছাড়েন অনেকে

রুবি জেনারেল হাসপাতালের ক্যানসার বিশেষজ্ঞ সঞ্জয় রায়ের কথায়, অনেক রোগী প্রথম কেমোথেরাপি নেওয়ার পরেই আর চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারেন না। কারণ, ক্যানসারের একাধিক ওষুধের দাম অত্যন্ত বেশি।

তিনি জানান, স্তন ক্যানসারের একটি বহুল ব্যবহৃত ওষুধের পেটেন্টযুক্ত সংস্করণের দাম একসময় মাসে প্রায় ১ লক্ষ টাকা ছিল। পেটেন্টের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বর্তমানে সেই ওষুধের দাম কমে প্রায় ৩,০০০ টাকা হয়েছে।

সঞ্জয় রায়ের মতে, নতুন মূল্য সংশোধনের ফলে আরও অনেক ওষুধের দাম কমবে। তবে ভারতে তৈরি বায়োসিমিলার ওষুধের ব্যবহার বাড়ানোর জন্য সরকারের আরও উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

৭৫ হাজার টাকার ওষুধ এখন ১২ হাজারের কিছু বেশি

ওষুধের দাম কমার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ দিয়েছেন মণিপাল হাসপাতালের কনসালট্যান্ট মেডিক্যাল অনকোলজিস্ট ইন্দ্রনীল ঘোষ। তাঁর বক্তব্য, Bevaceril 400 নামের একটি ক্যানসারের ওষুধের দাম ৭৫,৭১৮ টাকা থেকে কমে হয়েছে ১২,৬৬৮ টাকা।

এই ওষুধটি Anti-angiogenic শ্রেণির। ক্যানসারের টিস্যুতে নতুন রক্তনালি তৈরি হওয়া আটকাতে সাহায্য করে এটি। এর ফলে টিউমারের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে। কোলন ক্যানসার, ওভারিয়ান ক্যানসার এবং ব্রেন টিউমারের চিকিৎসায় এই ধরনের ওষুধ ব্যবহার করা হয়।

ইন্দ্রনীল ঘোষ জানান, বায়োসিমিলার ওষুধ এবং Monoclonal Antibody-র ক্ষেত্রে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মূল্যহ্রাস দেখা গিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে Pertuzumab, Bevacizumab, Cetuximab-সহ ভারতে তৈরি কয়েকটি ওষুধ।

বায়োসিমিলার ও জেনেরিক ওষুধে মিলবে স্বস্তি

বায়োসিমিলার হল এমন এক ধরনের বায়োলজিক্যাল ওষুধ, যা আগে থেকে অনুমোদিত কোনও মূল ওষুধের সঙ্গে অত্যন্ত সাদৃশ্যপূর্ণ। এর কার্যকারিতা ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে মূল ওষুধের তুলনায় clinically meaningful কোনও পার্থক্য থাকে না।

ইন্দ্রনীল ঘোষের মতে, Azacitidine, Pemetrexed, Palbociclib এবং Abiraterone-এর মতো জেনেরিক কেমোথেরাপি ও ক্যানসারের ওষুধের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে।

তবে সব দামি ওষুধের ক্ষেত্রে একই সুবিধা মিলবে না। তাঁর বক্তব্য, Pembrolizumab, Durvalumab এবং Enfortumab-এর মতো বহুজাতিক সংস্থার পেটেন্টযুক্ত ওষুধের দাম এই সংশোধনের ফলে সম্ভবত অপরিবর্তিত থাকবে। এই ওষুধগুলি এখনও অত্যন্ত ব্যয়বহুল।

চিকিৎসার মাঝপথে বিরতি পড়লে কমে যেতে পারে সাফল্যের সম্ভাবনা

মেডিক্যাল অনকোলজি বিভাগের প্রধান ও সিনিয়র কনসালট্যান্ট সুদীপ দাসের মতে, বহু পরিবারের পক্ষে ক্যানসারের ওষুধের খরচ দীর্ঘদিন ধরে বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে। অথচ কেমোথেরাপি, টার্গেটেড থেরাপি এবং দীর্ঘদিন ধরে খেতে হয় এমন অ্যান্টি-ক্যানসার ওষুধের ক্ষেত্রে চিকিৎসার ধারাবাহিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, আর্থিক সমস্যার কারণে রোগী যদি কেমোথেরাপির কোনও সাইকেল বাদ দেন, ওষুধের ডোজ কমিয়ে দেন অথবা নির্ধারিত সময়ের আগেই চিকিৎসা বন্ধ করেন, তাহলে চিকিৎসার নির্ধারিত ডোজের সামগ্রিক মাত্রা বা Relative Dose Intensity কমে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে চিকিৎসার ফলাফলে।

অর্থাৎ, শুধু ওষুধের দাম কমানো নয়, রোগী যাতে নির্ধারিত সময় ধরে চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারেন, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শুধু ওষুধ নয়, চিকিৎসার অন্যান্য খরচ কমানোর দাবি

বিপি পোদ্দার হাসপাতালের গ্রুপ অ্যাডভাইজার সুপ্রিয় চক্রবর্তীর মতে, ক্যানসার চিকিৎসায় ব্যবহৃত প্রয়োজনীয় Consumables এবং Medical Devices-এর দামও কমানো হলে রোগী ও পরিবারের উপর আর্থিক চাপ আরও কমবে।

তিনি বলেন, ওষুধের দাম কমার পাশাপাশি চিকিৎসার অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর খরচ কমলে সামগ্রিক ক্যানসার চিকিৎসা আরও সাশ্রয়ী হতে পারে। এতে রোগী ও তাঁর পরিবারের চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার আত্মবিশ্বাস বাড়বে।

সুপ্রিয় চক্রবর্তীর কথায়, ক্যানসার ধরা পড়ার পর রোগী ও পরিবারের উপর মানসিক চাপ তৈরি হয়। তার সঙ্গে চিকিৎসার খরচ বহন করতে না পারার ভয়ও যুক্ত হয়। আর্থিক সমস্যার কারণে চিকিৎসা শুরু করতে দেরি হতে পারে, নির্ধারিত চিকিৎসার সময়সূচি ব্যাহত হতে পারে এবং প্রয়োজনীয় থেরাপি বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়।

তাঁর মতে, ওষুধের দাম কমলে চিকিৎসক, রোগী এবং পরিবারের সামনে উপযুক্ত চিকিৎসা শুরু করা ও তা চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে আরও কিছুটা নমনীয়তা তৈরি হবে। রোগের অগ্রগতি বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে চিকিৎসা পরিবর্তনের প্রয়োজন হলেও তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হতে পারে।

৫৪৩টি ক্যানসার ওষুধের দাম সংশোধনের সিদ্ধান্তকে চিকিৎসকরা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। তাঁদের আশা, ওষুধের খরচ কমলে আর্থিক কারণে চিকিৎসা মাঝপথে বন্ধ করে দেওয়ার প্রবণতা কমবে। তবে ক্যানসার চিকিৎসাকে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনতে ওষুধের পাশাপাশি পরীক্ষা, চিকিৎসার সরঞ্জাম এবং হাসপাতালের অন্যান্য খরচও কমানোর প্রয়োজন রয়েছে।

Essential Business Intelligence, Sharp Market Insights, Practical Personal Finance Advice, Daily Fuel, Gold and Silver Prices and Latest Stories – On Kolkata24x7 Business

Related Articles

Back to top button

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker