বাঙালির তিন আইকনকে জন্মশতবর্ষে শ্রদ্ধা, জার্সি সিটির পুজো যেন একান্নবর্তী পরিবারের উদযাপন

বাঙালির কাছে দুর্গাপূজা তো কেবল উৎসব নয়, এ যেন বাঙালির সাংস্কৃতিক সত্তা, ইতিহাস, আবেগ ও আত্মপরিচয়ের পুনরাবিষ্কার। সেটা শুধু কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ বলে নয়। ভারত তথা বিশ্বের সব প্রান্তে। বাঙালি তো দুনিয়ার সব জায়গায় আছে। সারা বছরের ‘একলা চলো রে’ ভুলে বিদেশ-বিভুঁইয়ে পুজোর ক’টা দিন সবাই-ই একান্নবর্তী পরিবারের অংশ। আমেরিকার নিউ জার্সির গার্ডেন স্টেট পুজো কমিটির পুজো চেষ্টা করে বাঙালির চিরাচরিত আটপৌরে সংসারটা ধরে রাখতে। আর এবার তারা শ্রদ্ধা জানাচ্ছে জন্মশতবর্ষে পা রাখা বাঙালির তিন আইকনকে।
এবার ৪৫ বছরে পা দিল নিউ জার্সির ‘জিএসপিসি’র পুজো। বিদেশের অধিকাংশ পুজোর মতো সেখানেও পুজো হয় সপ্তাহান্তে। এবার ১৬, ১৭, ১৮ অক্টোবর জার্সি সিটির ডিকিনসন হাই স্কুলে তাদের পুজো। এই স্কুলের হলে একসময় বক্তৃতা দিতেন হেলেন কেলার। তিনদিনই থাকছে ধুমধাম করে সঙ্গীতানুষ্ঠান। এবার জার্সি সিটি মাতিয়ে তুলবেন শুভমিতা, অনির্বাণ ভট্টাচার্য ও হুলিগানিজম এবং অনিন্দ্য বোসের শহর। এ তো গেল ‘বাইরের’ শিল্পী। জার্সি সিটির বাঙালিরাও নাচে-গানে-নাটকে মাতিয়ে রাখেন। কচিকাঁচাদের কণ্ঠে শোনা যায় রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুলগীতি। তার প্রস্তুতি পুরোদমে চলছে। সেই গল্পই শোনালেন জার্সি সিটির পুজোর অন্যতম উদ্যোক্তা স্নেহম বন্দ্যোপাধ্যায়।
কর্মসূত্রে বহুবছর প্রবাসী। তবে শিকড় রয়েছে বাঙালিয়ানায়, ভারতীয়ত্বে। পুজোর ক’টা দিন সেটাকেই আঁকড়ে ধরতে চান। শুধু পুজোয় নয়, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে। পরের প্রজন্মকে বাংলার সংস্কৃতি, রীতি, উৎসব, পোশাক, খাওয়াদাওয়া সব বিষয়ের সঙ্গে পরিচিত করে তোলার চেষ্টা করে। এবার তারা শ্রদ্ধার্ঘ্য জানাচ্ছে, তিন বাঙালি আইকনকে। এবার জন্ম শতবর্ষ চলছে উত্তমকুমার, সুকান্ত ভট্টাচার্য ও মহাশ্বেতা দেবীকে। স্নেহমবাবু বলছিলেন, “আমরা নাচে-গানে-নাটকে তিন কিংবদন্তিকে শ্রদ্ধা জানাব। মহাশ্বেতা দেবীর আদিবাসী জীবন নিয়ে লেখা, কিশোর কবি সুকান্তের বিদ্রোহী কবিতা ও মহানায়ক উত্তমকুমারের জীবনকাহিনি তুলে ধরব। এছাড়া ১৫ মিনিটের একটি নাটক হচ্ছে। আট থেকে আশি, সপ্তাহান্তে রিহার্সাল দিচ্ছে। প্রতিদিন অনলাইনে মিটিং হয়।”

জিএসপিসি’র পুজোর অন্যতম বড় আকর্ষণ, ঠাকুরদালান। দৈর্ঘ্যে মোটামুটি ৮০ ফুট, আর প্রস্থে ২০ ফুট। বাঁশের ব্যবহার হয় না। পাইপ দিয়ে ভিতরের পুরো গড়নটা তৈরি হয়। খিড়কি জানলা, দরজার গোলাকৃতি মুখ, পায়রার বাসা—সব যেন বাস্তবের মতো। এখানকার মানুষ প্যান্ডেল ব্যাপারটা কী জানেন না। ফলে তাঁদের কাছে বাংলার সংস্কৃতি তুলে ধরার এটাও একটা উপায়। স্নেহমবাবু বলছিলেন, “তিন বছর হল এই ঠাকুরদালান শুরু হয়েছে। কয়েকমাস ধরে ৪০-৫০ জন সময় বের করে ঠাকুরদালান তৈরির অনুশীলন করি। এবার চেষ্টা করছি, নতুন রং করে, নতুন রূপ দেওয়া। এবার শুক্রবার থেকে ঠাকুরদালান তৈরির কাজ চলবে। তাতে অন্যরা হাত লাগায়। আসলে আমরা সেই মতবাদে বিশ্বাস করি, আয় আরও বেঁধে বেঁধে থাকি।” সঙ্গে থাকে দেদার খাওয়াদাওয়া। খিচুড়ি, লাবরা যেমন থাকে, তেমনই থাকে বিরিয়ানি, পাঁঠার মাংস। এই আয়োজনের নাম তারা রেখেছেন ‘বঙ্গভোজ’।

বাগবাজারের দুর্গাপ্রতিমার যে সাবেকি রূপ, সেটাই অনুসরণ করা হয়। পুরোটাই ফাইবারের তৈরি। জাহাজে করে মূর্তি আসে, তাকেই প্রতি বছর যত্নসহকারে সাজিয়ে তোলা হয়। মোটামুটি পাঁচ-ছয় বছর ব্যবহার করার পর নতুন মূর্তি আনা হয়। পুজোর পুরো জায়গাটা আমরা যামিনী রায়ের ছবি দিয়ে সাজিয়ে তোলা হয়। দশমীর দিন অন্তত ১৫০০ লোকের সমাগম হয় এখানে। লাল-পেড়ে সাদা শাড়িতে মহিলাদের সিঁদুর খেলা থেকে ঢাকের তালে ধুনুচি নাচ নাচেন। তাদের ইচ্ছা, ৫০ বছরে নতুন মূর্তি নিয়ে আসার।

অনুষ্ঠান আয়োজন থেকে সমগ্র পুজো পরিকল্পনা, তার পিছনে একটা মহৎ উদ্দেশ্য থাকে। কলকাতার দুটো স্কুলকে— একটি অনাথ আশ্রম ও গোলপার্ক রামকৃষ্ণ মিশনের গদাধর পাঠশালাকে অর্থসাহায্য করা হয়। কোভিড হোক বা যশ ঘূর্ণিঝড়, অসহায়-বিপদগ্রস্ত মানুষের জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। মায়ের আগমনী আরও বেশি করে সেই সুযোগ এনে দেয়। মা দুর্গা আসেন সন্তানদের মুখে হাসি ফোটাতে। প্যান্ডেল হপিং, খাওয়াদাওয়া, নতুন জামাকাপড়—উৎসব মুখরতায় ভরে থাকে কয়েকটা দিন। কিন্তু প্রদীপের নিচে তো অন্ধকারও থাকে। পুজো তো তাদেরও। সেই দুস্থ মানুষদের দিনগুলোকে আনন্দে ভরিয়ে তোলা কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। নাহলে যে মায়ের আগমনের উদ্দেশ্যটাই মাটি।
শেয়ার
লিংক



