পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে ভারতের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও মজবুত করতে আগ্রহী ইউরোপ

নয়াদিল্লি, ৩ নভেম্বর : পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে ভারতের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে আগ্রহ বাড়ছে ইউরোপের দেশগুলির। ইউরোপীয় ফ্রি ট্রেড অ্যাসোসিয়েশন (ইএফটিএ) চুক্তি এবং প্রস্তাবিত ভারত-ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সেই আগ্রহেরই প্রতিফলন বলে ব্রাসেলসভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘ব্রাসেলস সিগন্যাল’-এর একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ১ অক্টোবর কার্যকর হওয়া ইএফটিএ চুক্তির আওতায় সুইজারল্যান্ড, নরওয়ে, আইসল্যান্ড এবং লিশটেনস্টাইন গত ৭ অক্টোবর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় ভারত-ইএফটিএ প্রসপারিটি সামিটে অংশ নেয়। বৈঠকে দুই পক্ষ একাধিক নতুন ব্যবসায়িক প্রকল্পের ঘোষণা করে এবং চুক্তির অগ্রগতি পর্যালোচনা করে।
সুইজারল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট গাই পারমেলিন জানান, তাঁর দেশের ৫৩টি সংস্থা ভারতের ২০টি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে। অন্যদিকে নরওয়ে জানায়, ভারতে তাদের প্রায় ১৬০টি সংস্থা কাজ করছে। উন্নত উৎপাদন শিল্প, চিকিৎসা প্রযুক্তি, সামুদ্রিক পরিবহণ এবং জ্বালানি ক্ষেত্রে বিনিয়োগের নতুন সম্ভাবনাও চিহ্নিত করেছে দুই দেশ।
তবে এসব ঘোষণার মাধ্যমে চুক্তির সম্পূর্ণ সাফল্যের ছবি পাওয়া যাচ্ছে না বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। চুক্তির প্রথম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে প্রকাশিত সরকারি নথিতে নতুন করে কত বিনিয়োগ বাস্তবে এসেছে কিংবা এই চুক্তির ফলে সরাসরি কত কর্মসংস্থান হয়েছে, তার কোনও সামগ্রিক হিসাব দেওয়া হয়নি। ভারত সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ভারতে সুইজারল্যান্ডের বিনিয়োগ ২০২ মিলিয়ন ডলার বা ১৮১ মিলিয়ন ইউরো বেড়েছে।
এদিকে ইএফটিএ-র অন্তর্ভুক্ত নয় ইউরোপীয় ইউনিয়নও ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। চলতি বছরের ডিসেম্বর মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ব্রাসেলস সফরের সময় চুক্তি চূড়ান্ত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি সদস্য দেশের মধ্যে পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১১৮ বিলিয়ন ইউরো। এর মধ্যে ইউরোপ ভারত থেকে ৬৯.৫ বিলিয়ন ইউরোর পণ্য আমদানি করেছে এবং ভারতে ৪৮.৯ বিলিয়ন ইউরোর পণ্য রফতানি করেছে। ফলে ইউরোপের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২০.৬ বিলিয়ন ইউরো।
এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পণ্য বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আমেরিকার পরেই ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার ইউরোপীয় ইউনিয়ন। চিনের থেকেও এগিয়ে রয়েছে ইইউ। যা দুই পক্ষের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণের বিপুল সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়েছে, ২০২৪ সালে ভারতে ইউরোপীয় প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১৩২.৮ বিলিয়ন ইউরো। ভারতে ৬,০০০-এরও বেশি ইউরোপীয় সংস্থা প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। এই সংস্থাগুলি সরাসরি প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে।
ইউরোপীয় কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ব্রাসেলসের সঙ্গে আলোচনাধীন বাণিজ্য চুক্তিতে ইউরোপের ৯৬.৬ শতাংশ পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে শুল্ক হ্রাস বা সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের ব্যবস্থা রয়েছে। চুক্তিটি সম্পূর্ণ কার্যকর হলে ইউরোপীয় রফতানিকারীদের বছরে প্রায় ৪ বিলিয়ন ইউরো শুল্ক সাশ্রয় হতে পারে বলে অনুমান করা হয়েছে।
আমেরিকা ও চিনের মধ্যে চলতে থাকা শুল্কযুদ্ধের আবহে ভারত-ইউরোপ বাণিজ্য সম্পর্কের এই অগ্রগতি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।



