0%

হ্যাকারদের নিশানায় একাধিক দেশের সুপারমার্কেটের ফ্রিজ! নষ্ট টন টন খাবার

সবদিক নিউজ: সাইবার অপরাধীরা এবার আর শুধু কম্পিউটার বা ব্যক্তিগত তথ্য চুরির মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখছে না। সরাসরি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন এবং খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকে বিপদের মুখে ফেলে দেওয়ার মতো কৌশল নিয়েছে হ্যাকাররা। এবার তাদের নিশানায় ইউরোপের (Europe) বিভিন্ন দেশের সুপারমার্কেটের (Supermarket) ফ্রিজ ও ফ্রিজার। ইন্টারনেটের মাধ্যমে দোকানের শীতলীকরণ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে বদলে দেওয়া হচ্ছে যন্ত্রগুলির তাপমাত্রা। কোথাও কোথাও ফ্রিজারের তাপমাত্রা বেড়ে পৌঁছে গিয়েছে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। এর ফলে মাছ, মাংস, দুধ, পনির-সহ বিপুল পরিমাণ পচনশীল খাবার নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আয়ারল্যান্ড, সুইডেন, বেলজিয়াম, লুক্সেমবার্গ, এস্তোনিয়া এবং ফিনল্যান্ড—ইউরোপের অন্তত ছয়টি দেশে এই ধরনের সাইবার হামলার প্রভাব পড়েছে। ঘটনায় স্বাভাবিক ভাবেই উদ্বেগ বেড়েছে প্রশাসন থেকে শুরু করে সুপারমার্কেট কর্তৃপক্ষের মধ্যে। কারণ, এই হামলা শুধু ব্যবসায়িক ক্ষতি করছে না, খাদ্য সংরক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে।

ইউরোপে (Europe) হ্যাকারদের নিশানায় সুপারমার্কেটের ফ্রিজ! নষ্ট টন টন খাবার:

বিভিন্ন দেশের একাধিক বড় বিপণি সংস্থার দোকানে ইতিমধ্যেই এই সমস্যার কথা সামনে এসেছে। সুইডেনের আইসিএ এবং কোপ সুপারমার্কেট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের কয়েকটি দোকানের শীতলীকরণ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোপের অন্তত ছ’টি দোকানে এই সমস্যা দেখা গিয়েছে। অন্য দিকে, স্টকহোমের আইসিএ-র একটি বিপণিতে ফ্রিজারের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছয়। দোকানের বিক্রয় বিভাগের দায়িত্বে থাকা এঙ্গলা ইংওয়াল জানিয়েছেন, রাত প্রায় দু’টো নাগাদ এই হামলা হয়েছিল। কিন্তু ভোর সাড়ে পাঁচটার আগে কর্মীদের নজরে বিষয়টি আসেনি। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে ফ্রিজারের ভিতরে থাকা খাবার স্বাভাবিক তাপমাত্রায় সংরক্ষিত রাখা সম্ভব হয়নি। আয়ারল্যান্ডেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। দেশের (Europe) বড় সুপারমার্কেট সংস্থা সুপারভ্যালুর মোট ২২৩টি দোকানের মধ্যে ১৩টিতে সমস্যা দেখা দিয়েছে। সংস্থার মালিক মুসগ্রেভ জানিয়েছে, নির্দিষ্ট একটি মডেলের শীতলীকরণ যন্ত্রে এই গোলযোগ ধরা পড়েছে। সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে সংশ্লিষ্ট দোকানগুলি থেকে সমস্ত ঠান্ডা ও হিমায়িত খাবার সরিয়ে ফেলা হয়েছে।

 আবেদন বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক! অভিষেকের মামলায় হাইকোর্টকে অনুরোধ সুপ্রিম কোর্টের

বেলজিয়ামেও একাধিক সুপারমার্কেট এই হামলার প্রভাব থেকে রেহাই পায়নি। ক্যারিফোরের প্রায় ৭০০টি দোকানের মধ্যে ১৫টিতে শীতলীকরণ ব্যবস্থায় সমস্যার কথা স্বীকার করেছে কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া কোলরুইট গোষ্ঠীর অধীন পাঁচটি স্পার দোকানেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বেলজিয়াম ও লুক্সেমবার্গে অহোল্ড ডেলহাইজের কয়েকটি বিপণিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। এস্তোনিয়ার অন্তত একটি সুপারমার্কেট এবং ফিনল্যান্ডের কেস্কো গোষ্ঠীর কয়েকটি ছোট দোকানেও ফ্রিজের তাপমাত্রায় অস্বাভাবিক পরিবর্তন ধরা পড়েছে। এই ঘটনাগুলির পিছনে ঠিক কী ধরনের প্রযুক্তিগত হস্তক্ষেপ রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক ধারণা, দোকানের শীতলীকরণ যন্ত্রগুলিকে দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগকেই কাজে লাগাচ্ছে সাইবার অপরাধীরা। বেলজিয়ামের শীতলীকরণ যন্ত্র প্রস্তুতকারী সংস্থা সাবকোবেলের প্রধান স্টিফান মোয়েলান্সের বক্তব্য, হ্যাকাররা ফ্রিজের বাষ্পীভবন যন্ত্রগুলিকে ডিফ্রস্ট মোডে চালু করে দিয়েছিল। সাধারণত যন্ত্রের ভিতরে জমে থাকা বরফ গলানোর জন্য এই ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ ডিফ্রস্ট মোড চালু থাকলে ফ্রিজের তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে যায়। ফলে খাবার সংরক্ষণের পরিবেশ নষ্ট হয়ে পড়ে।

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, সুপারমার্কেটগুলিকে নিশানা করার পিছনে রয়েছে তাদের প্রযুক্তিগত পরিকাঠামোর জটিলতা। একটি বড় বিপণিতে ফ্রিজ ও ফ্রিজার ছাড়াও দরজার নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ভবন পরিচালনা, নজরদারি এবং পেমেন্ট সিস্টেমের মতো একাধিক পরিষেবা একই নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। এই সংযোগগুলির নিরাপত্তায় ফাঁক থাকলে হ্যাকারদের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রে হস্তক্ষেপ করা সহজ হয়ে যায়। সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা সেনটিনেলওয়ানের গবেষক টম হেগেলও এই বিষয়ে সতর্ক করেছেন। তাঁর মতে, একাধিক ব্যবস্থা একই প্রযুক্তিগত পরিকাঠামোর উপর নির্ভরশীল হওয়ায় সুপারমার্কেটগুলি সাইবার অপরাধীদের সহজ নিশানা হয়ে উঠতে পারে। তবে ইউরোপে এই ধরনের হামলার ঘটনা এবারই প্রথম নয়। এর আগে গত ১২ অক্টোবর ফ্রান্সের প্রায় ৭০০টি সুপারমার্কেটের শীতলীকরণ ব্যবস্থায় একই ধরনের সাইবার হামলার অভিযোগ উঠেছিল। কয়েকটি ক্ষেত্রে ফ্রিজারের তাপমাত্রা মাইনাস ২৭ ডিগ্রি থেকে বেড়ে ৫০ ডিগ্রিরও বেশি হয়ে যায়। বিপুল পরিমাণ খাবার নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি কিছু জায়গায় যন্ত্র অতিরিক্ত গরম হয়ে আগুন লাগার ঘটনাও ঘটেছিল।

 আধুনিক অস্ত্র, উন্নত প্রশিক্ষণেই বদলাচ্ছে ছবি! ৪৭ বছরে এই প্রথম CRPF-এ শূন্য প্রাণহানি

এখনও পর্যন্ত ইউরোপের সাম্প্রতিক হামলাগুলির দায় কোনও হ্যাকার গোষ্ঠী স্বীকার করেনি। বিভিন্ন দেশে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলির পিছনে একই অপরাধী চক্র রয়েছে কি না, তা-ও নিশ্চিত ভাবে জানা যায়নি। তবে একের পর এক সুপারমার্কেটের শীতলীকরণ ব্যবস্থায় এই ধরনের হস্তক্ষেপ ইউরোপের প্রশাসনকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। ইউরোপীয় কমিশনের তরফেও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তাদের আশঙ্কা, সাইবার হামলার প্রভাব কেবল কোনও একটি সংস্থা বা ব্যবসার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা এবং খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকেও সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষ করে দুধ, মাছ, মাংসের মতো দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়া খাবার সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সামান্য প্রযুক্তিগত গোলযোগও বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তাই ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনা ঠেকাতে সুপারমার্কেটগুলির প্রযুক্তিগত নেটওয়ার্কের নিরাপত্তা বাড়ানো, যন্ত্রগুলির উপর নিয়মিত নজরদারি এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে (Europe)।

Related Articles

Back to top button

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker