0%

পিএফের টাকা স্টার্টআপে ঢালার পরিকল্পনা, কতটা নিরাপদ অবসর সঞ্চয়?

নয়াদিল্লি: কর্মীদের প্রভিডেন্ট ফান্ডের (PF) টাকা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন কৌশল নেওয়ার কথা ভাবছে Employees’ Provident Fund Organisation (EPFO)। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংস্থার নতুন বার্ষিক বিনিয়োগের ৩ শতাংশ Alternative Investment Fund (AIF)-এ বিনিয়োগের জন্য নির্দেশিকা তৈরির কাজ চলছে। এই প্রস্তাব কার্যকর হলে স্টার্টআপ, প্রাইভেট ইক্যুইটি এবং অন্যান্য দ্রুত বিকাশশীল ব্যবসায় বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে।

তবে প্রস্তাবটি এখনও চূড়ান্ত হয়নি। EPFO-র Central Board of Trustees (CBT)-এর অনুমোদন প্রয়োজন। এতদিন মূলত সরকারি সিকিউরিটিজ, ঋণপত্র এবং তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগের উপর নির্ভর করেছে কর্মীদের অবসরকালীন সঞ্চয় পরিচালনাকারী এই সংস্থা। নতুন পরিকল্পনা কার্যকর হলে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কিছুটা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদও যুক্ত হতে পারে।

প্রশ্ন হল, বর্তমানে EPFO আপনার PF-এর টাকা কোথায় বিনিয়োগ করে? কেন এই টাকা বিভিন্ন ক্ষেত্রে ছড়িয়ে রাখা হয়? আর স্টার্টআপে বিনিয়োগ শুরু হলে কর্মীদের সঞ্চয়ের উপর কতটা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে?

নতুন ৩ শতাংশ বিনিয়োগের পরিকল্পনা কী?

The Times of India-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, EPFO-র নতুন বার্ষিক বিনিয়োগের ৩ শতাংশ Category I এবং Category II AIF-এ বিনিয়োগের প্রস্তাব বিবেচনা করা হচ্ছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। প্রস্তাবিত বিনিয়োগের অর্থ আসবে সংশ্লিষ্ট বছরে EPFO-র নতুন জমা বা বিনিয়োগযোগ্য অর্থ থেকে। অর্থাৎ সংস্থার পরিচালিত প্রায় ৩০ লক্ষ কোটি টাকার সম্পূর্ণ অবসরকালীন তহবিলের ৩ শতাংশ একসঙ্গে AIF-এ সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা নয়।

AIF বা Alternative Investment Fund হল এমন একটি বিনিয়োগ ব্যবস্থা, যেখানে একাধিক বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে নির্দিষ্ট কৌশল অনুযায়ী বিভিন্ন সম্পদে বিনিয়োগ করা হয়। সাধারণ মিউচুয়াল ফান্ডের তুলনায় AIF-এ তুলনামূলক কম তরল সম্পদ, তালিকাভুক্ত নয় এমন সংস্থা এবং বিশেষ ধরনের ব্যবসায় বিনিয়োগের সুযোগ থাকে।

Category I AIF সাধারণত স্টার্টআপ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা, সামাজিক উদ্যোগ এবং পরিকাঠামোর মতো ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করে। অন্যদিকে Category II AIF-এর মধ্যে প্রাইভেট ইক্যুইটি ও ডেট ফান্ডের মতো বিনিয়োগের ধরন রয়েছে।

বর্তমানে EPFO আপনার PF-এর টাকা কোথায় বিনিয়োগ করে?

EPFO-র অধীনে প্রায় ৩০ কোটি সদস্যের অবসরকালীন সঞ্চয় পরিচালিত হয়। সংস্থার মোট তহবিলের পরিমাণ প্রায় ৩০ লক্ষ কোটি টাকা। এই অর্থ কর্মীদের ভবিষ্যৎ অবসরকালীন প্রয়োজন মেটানোর জন্য জমা রাখা হয়। তাই বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মূলধনের নিরাপত্তা এবং নিয়মিত আয়, দুটিকেই গুরুত্ব দিতে হয়।

অর্থ মন্ত্রকের নির্ধারিত বিনিয়োগ কাঠামো অনুযায়ী, EPFO বিভিন্ন সম্পদ শ্রেণিতে অর্থ বিনিয়োগ করে। Fintoo-র প্রধান নির্বাহী মণীশ পি হিঙ্গার Mint-কে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিনিয়োগের বিস্তৃত সীমা হল:

বিনিয়োগের ক্ষেত্রবরাদ্দের সীমা
সরকারি সিকিউরিটিজ৪৫-৫০%
রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ও কর্পোরেট বন্ড৩৫-৪৫%
মানি মার্কেট ইনস্ট্রুমেন্টসর্বোচ্চ ৫%
ইক্যুইটি ও সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগ৫-১৫%
REITs, InvITs ও অনুরূপ সম্পদসর্বোচ্চ ৫%

এই বরাদ্দের সীমাগুলি EPFO-র বিনিয়োগের অনুমোদিত কাঠামো বোঝায়। এগুলি প্রত্যেক বছর বাস্তবে ঠিক এই অনুপাতে অর্থ বিনিয়োগ করা হয়, এমন নিশ্চয়তা নয়।

সরকারের তরফে জানানো হয়েছে, EPFO সরাসরি শেয়ারবাজারের কোনও নির্দিষ্ট সংস্থার শেয়ার কেনে না। নির্ধারিত নিয়ম ও সীমার মধ্যে পেশাদার পোর্টফোলিও ম্যানেজারদের মাধ্যমে বিনিয়োগ পরিচালনা করা হয়।

কেন PF-এর টাকা বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করা হয়?

PF-এর টাকা শুধু জমিয়ে রাখলে হয় না। দীর্ঘমেয়াদে মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব সামলে সঞ্চয়ের প্রকৃত মূল্য বজায় রাখাও জরুরি। সেই কারণেই EPFO বিভিন্ন ধরনের সম্পদে অর্থ বিনিয়োগ করে।

সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ তুলনামূলক নিরাপদ এবং নির্দিষ্ট আয় পাওয়ার সুযোগ তৈরি করে। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ও কর্পোরেট বন্ড থেকেও সুদ বাবদ আয় আসে। অন্যদিকে ইক্যুইটি বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদে বেশি রিটার্নের সম্ভাবনা তৈরি করে, যদিও এতে বাজারের ওঠানামার ঝুঁকি রয়েছে।

অর্থাৎ EPFO-র বিনিয়োগ কৌশলের মূল লক্ষ্য হল নিরাপত্তা ও রিটার্নের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা। অবসরকালীন সঞ্চয় হওয়ায় অতিরিক্ত ঝুঁকি নেওয়ার সুযোগ এখানে সীমিত।

স্টার্টআপে বিনিয়োগ হলে PF-এর টাকা কি ঝুঁকিতে পড়বে?

AIF-এ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কিছু অতিরিক্ত ঝুঁকি রয়েছে। স্টার্টআপ বা তালিকাভুক্ত নয় এমন সংস্থার ব্যবসায়িক সাফল্য নিশ্চিত নয়। এই ধরনের বিনিয়োগ দ্রুত নগদে পরিণত করাও কঠিন হতে পারে। পাশাপাশি সংস্থার মূল্যায়ন বা Valuation নির্ধারণেও অনিশ্চয়তা থাকে।

তাই EPFO-র প্রস্তাবিত কাঠামোয় কয়েকটি সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা রাখার কথা বিবেচনা করা হচ্ছে বলে TOI-র প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

  • ন্যূনতম ফান্ডের আকার: AIF-এর মোট তহবিল কমপক্ষে ১০০ কোটি টাকা হতে হবে।
  • বিনিয়োগের সীমা: কোনও একটি নির্দিষ্ট ফান্ডে কত টাকা বিনিয়োগ করা যাবে, তার উপর সীমাবদ্ধতা থাকবে।
  • বিদেশি বিনিয়োগে নিয়ন্ত্রণ: ভারতের বাইরে নিবন্ধিত সংস্থায় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ থাকবে।
  • ফান্ড ম্যানেজারের স্বাধীনতা: ফান্ড ম্যানেজাররা যাতে প্রোমোটারদের প্রভাবমুক্ত থেকে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা রাখা হবে।

প্রাথমিক পর্যায়ে সরাসরি কোনও নির্দিষ্ট স্টার্টআপে অর্থ বিনিয়োগ না করে National Investment and Infrastructure Fund (NIIF) এবং Small Industries Development Bank of India (SIDBI)-এর মতো প্রাতিষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিনিয়োগের সম্ভাবনাও রয়েছে।

Startup India Fund of Funds 2.0-এর ভূমিকা কী?

২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে সরকার ১০,০০০ কোটি টাকার Startup India Fund of Funds 2.0 প্রকল্পের বিজ্ঞপ্তি জারি করে। এর উদ্দেশ্য হল স্টার্টআপগুলির জন্য ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ও গ্রোথ ক্যাপিটালের জোগান বাড়ানো।

এই প্রকল্পের মাধ্যমে যোগ্য Sebi-নিবন্ধিত AIF-গুলির মধ্যে অর্থ সরবরাহ করা হবে। বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে Deep Technology, প্রাথমিক পর্যায়ের ব্যবসা এবং উদ্ভাবনী উৎপাদন ক্ষেত্রকে। SIDBI এই প্রকল্পের প্রাথমিক বাস্তবায়নকারী সংস্থা।

EPFO যদি ভবিষ্যতে এই ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের মাধ্যমে AIF-এ অর্থ দেয়, তাহলে স্টার্টআপ ক্ষেত্রে অর্থের জোগান বাড়তে পারে। একই সঙ্গে কর্মীদের PF-এর টাকা নতুন ধরনের সম্পদের সঙ্গে যুক্ত হবে।

PF সদস্যদের এখন কী জানা জরুরি?

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, AIF-এ ৩ শতাংশ বিনিয়োগের পরিকল্পনা এখনও প্রস্তাবের পর্যায়ে রয়েছে। EPFO-র Central Board of Trustees-এর অনুমোদন ছাড়া এই পরিকল্পনা কার্যকর হবে না। তাই এখনই কর্মীদের PF-এর টাকা স্টার্টআপে বিনিয়োগ শুরু হয়ে গিয়েছে বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলেও বিনিয়োগের অর্থ নতুন বার্ষিক জমার একটি অংশ থেকে আসার কথা। পুরো অবসরকালীন তহবিলের উপর সরাসরি এই পরিবর্তনের প্রভাব পড়বে না। তবে AIF-এ বিনিয়োগের ঝুঁকি, ফান্ড নির্বাচনের নিয়ম এবং সম্ভাব্য রিটার্নের বিষয়গুলি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

কর্মীদের অবসরকালীন সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে মূলধনের নিরাপত্তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই নতুন বিনিয়োগ কৌশল চালু হলে তার সুরক্ষাবিধি, ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘমেয়াদি রিটার্নের উপর নজর রাখা প্রয়োজন।

Essential Business Intelligence, Sharp Market Insights, Practical Personal Finance Advice, Daily Fuel, Gold and Silver Prices and Latest Stories – On Kolkata24x7 Business

Related Articles

Back to top button

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker