0%

জ্ঞানেশ কুমারকে প্রথম নিশানা, মোদী-শাহকে বার্তা রাহুলের

নয়াদিল্লি: প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ রাজনৈতিক ক্ষমতার শীর্ষে থাকলেও বিরোধীদের প্রথম নিশানায় রয়েছেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (CEC) জ্ঞানেশ কুমার। শনিবার দিল্লিতে ইন্ডি জোটের এক কর্মসূচিতে এমনই স্পষ্ট বার্তা দিলেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী (Rahul Gandhi)। তাঁর অভিযোগ, জ্ঞানেশ কুমার শাসক শিবিরের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছেন। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে দুর্বল করার সঙ্গে যাঁরা যুক্ত, তাঁদের কাউকেই জবাবদিহি থেকে রেহাই দেওয়া হবে না বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।

দিল্লিতে ইন্ডি জোটের ওই কর্মসূচিতে বিরোধী নেতারা প্রতীকীভাবে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া পরিচালনা করেন। সেখানেই বক্তব্য রাখতে গিয়ে রাহুল বলেন, “মিস্টার মোদী এবং মিস্টার শাহ হয়তো শীর্ষে রয়েছেন। তাঁদের সঙ্গে আমরা মোকাবিলা করব। কিন্তু আপনারা তাঁদের হাতিয়ার। তাই আপনারাই আমাদের প্রথম নিশানা।”

সাংবিধানিক রক্ষাকবচ থাকলেও দায় এড়ানো যাবে না, হুঁশিয়ারি

মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এবং তাঁর অধীনে থাকা আধিকারিকদের উদ্দেশে রাহুলের বার্তা, সাংবিধানিক পদে থাকার কারণে কেউই দায়বদ্ধতা থেকে মুক্তি পাবেন না। তাঁর কথায়, জ্ঞানেশ কুমার বা তাঁর অধীনে থাকা পাঁচ-সাত জন আধিকারিক যদি মনে করেন সাংবিধানিক রক্ষাকবচ তাঁদের বাঁচিয়ে দেবে, তাহলে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি এবং সাধারণ মানুষের মনোভাব বুঝে নেওয়া উচিত।

রাহুল আরও বলেন, রবিবার দিল্লিতে বিরোধীদের প্রস্তাবিত পদযাত্রা এবং জনসভায় দেশের মানুষের মনোভাব স্পষ্ট হয়ে যাবে। তাঁর দাবি, ঐক্যবদ্ধ বিরোধীরা একসঙ্গে রাস্তায় নেমে নির্বাচনী অনিয়ম নিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ তুলে ধরবে।

তিনি বলেন, “দেশের ঐক্যবদ্ধ বিরোধীরা আপনাদের দেখিয়ে দেবে দেশের মানুষের মনোভাব ঠিক কী।”

CBI, ED-র অপব্যবহারের অভিযোগ, ‘কাউকে ছাড়ব না’

নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকে কোনও এক সাংবিধানিক পদাধিকারীর বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্ন আন্দোলন হিসেবে দেখতে নারাজ রাহুল। তাঁর বক্তব্য, দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির অপব্যবহারের বিরুদ্ধে বৃহত্তর লড়াইয়ের অংশ এই কর্মসূচি।

রাহুলের অভিযোগ, নির্বাচনে কারচুপি, CBI ও ED-র মতো কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার অপব্যবহার এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। তবে এই পরিস্থিতি সাময়িক বলেই দাবি করেছেন তিনি।

কংগ্রেস নেতার কথায়, “আমরা আপনাদের পালিয়ে যেতে দেব না।” তাঁর দাবি, দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর উপর আঘাতের জন্য শুধু জ্ঞানেশ কুমারই দায়ী নন, আরও অনেকে রয়েছেন। তাঁদের পরিচয় বিরোধীরা জানে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

রাহুলের বক্তব্য, দেশের সংবিধান এবং সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর রক্ষা করাই তাঁদের লক্ষ্য। সেই লড়াই থেকে বিরোধীরা পিছিয়ে আসবে না বলেও স্পষ্ট করেছেন তিনি।

এদিন জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে শুধু অভিশংসনের দাবি নয়, তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে আদালতে বিচার শুরু করার দাবিকেও সমর্থন করেন রাহুল। তাঁর বক্তব্য, “জ্ঞানেশ কুমারকে শুধু অভিশংসিত করলেই হবে না, ন্যায়বিচারের স্বার্থে তাঁর বিরুদ্ধে আদালতে রাষ্ট্রদ্রোহের বিচারও হওয়া উচিত।”

খড়্গের বাসভবনে প্রতীকী অভিশংসন, উপস্থিত প্রায় ২৫০ জন

শনিবার কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গের ১০, রাজাজি মার্গের বাসভবনের লনে এই প্রতীকী কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। ইন্ডি জোটের সাংসদ, বিরোধী নেতাদের পাশাপাশি নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। প্রাক্তন লোকসভা স্পিকার মীরা কুমার সভার সভাপতিত্ব করেন। আয়োজনের ধরন ছিল অনেকটা সংসদীয় অধিবেশনের মতো।

জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে অভিশংসনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন মল্লিকার্জুন খড়্গে। সমাজবাদী পার্টির নেতা হরেন্দ্র মালিক প্রস্তাবটি সমর্থন করেন। রাহুল গান্ধী-সহ বিরোধী সাংসদ এবং নাগরিক সমাজের একাধিক প্রতিনিধি প্রস্তাবের পক্ষে মত দেন। শেষ পর্যন্ত হাত তুলে সর্বসম্মতভাবে প্রস্তাবটি গৃহীত হয়।

আয়োজকদের দাবি, অনুষ্ঠানে প্রায় ২৫০ জন বিরোধী সাংসদ, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং সংবাদমাধ্যমের কর্মী উপস্থিত ছিলেন। পাশাপাশি এমন কয়েকজনও সেখানে ছিলেন, যাঁদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা থেকে তাঁদের নাম ভুলভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে।

সংসদের বাইরে সংসদীয় পদ্ধতির আদলে এমন কর্মসূচি আয়োজনের বিষয়টি অস্বাভাবিক মনে হতে পারে বলে স্বীকার করেন রাহুল। তবে তাঁর দাবি, বিরোধীদের সামনে আর কোনও বিকল্প ছিল না। তাঁর অভিযোগ, দেশের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই বিরোধীদের জন্য কার্যত বন্ধ হয়ে গিয়েছে।

পুরনো লোকসভা কক্ষের আদলে তৈরি করা হয়েছিল মঞ্চ। কাঠের প্যানেল দিয়ে সাজানো পটভূমির সামনে অর্ধবৃত্তাকারভাবে আসন রাখা হয়েছিল। সেখানে দাঁড়িয়েই বিরোধী নেতারা নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে নিজেদের অভিযোগ এবং দাবিগুলি তুলে ধরেন।

খড়্গে অভিযোগ করেন, নির্বাচন কমিশন প্রধানমন্ত্রী মোদী এবং অমিত শাহের নির্দেশে কাজ করছে। তাঁর দাবি, কমিশন স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হচ্ছে এবং ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার মাধ্যমে নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত করার চেষ্টা চলছে। তাঁর মতে, এর ফলে দেশের মানুষের ভোটাধিকারই বিপদের মুখে পড়েছে।

বিরোধীদের কর্মসূচিকে ‘গণতন্ত্রের প্রহসন’ বলল BJP

ইন্ডি জোটের এই প্রতীকী অভিশংসন কর্মসূচির তীব্র সমালোচনা করেছে বিজেপি। গেরুয়া শিবিরের অভিযোগ, বিরোধীরা সংসদ এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে নিয়ে প্রহসন করছে।

বিজেপি মুখপাত্র সম্বিত পাত্র রাহুল গান্ধীকে নিশানা করে বলেন, বিরোধীরা চাইলে প্রতীকী সংসদ চালাতে পারে কিংবা মিছিল করতে পারে। কিন্তু রাহুলের রাজনৈতিক উত্থানের চেষ্টা বারবার ব্যর্থ হচ্ছে বলে কটাক্ষ করেন তিনি।

পাত্রের বক্তব্য, “আপনারা মক পার্লামেন্ট করুন কিংবা মিছিল বের করুন, বিশ্ব ইতিমধ্যেই বুঝে গিয়েছে যে রাহুল গান্ধীর মধ্যে এগিয়ে যাওয়ার মতো জ্বালানি নেই। এই স্যাটেলাইট কখনও উৎক্ষেপণ করা যাবে না।”

এমনকি রাহুলকে আজীবন ‘মক প্রধানমন্ত্রী’ করে রাখা যেতে পারে বলেও কটাক্ষ করেন বিজেপি মুখপাত্র। ফলে জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিরোধীদের আন্দোলন নতুন রাজনৈতিক সংঘাতের রূপ নিল। একদিকে বিরোধীদের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে গুরুতর অভিযোগ, অন্যদিকে বিজেপির পাল্টা আক্রমণ, দুই শিবিরের সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার ইঙ্গিত মিলছে।

Related Articles

Back to top button

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker