প্রবল জলস্রোতের তাণ্ডব, তবু আগাম সতর্কতা ও নজরদারিতেই ভুটানে বাঁচল প্রাণ?

নিয়ম করে নজরদারি চলছিল। প্রযুক্তির মাধ্যমে আগাম সতর্কতার ব্যবস্থাও হয়েছিল। এই দুই কারণেই হ্রদ ভেঙে চারপাশ ভেসে গেলেও প্রাণহানি এড়ানো গেল ভুটানে? পড়শি দেশে হ্রদ বিপর্যয়ের আগেই প্রযুক্তির মাধ্যমে সেই আগাম সতর্কতা ছড়িয়ে গিয়েছিল প্রায় সব জায়গায়। নেপালের বিপর্যয়ের পর থেকেই পাহাড়ের কোলে থাকা বিপজ্জনক হ্রদগুলির উপর নজরদারি শুরু হয় ভুটানে।
প্রায় প্রতিটি বিপজ্জনক হিমবাহ হ্রদে নজরদারি চালাতে পর্যবেক্ষণ সরঞ্জাম স্থাপন করেছে ড্রাগনের দেশ। তাই হ্রদ বেসামাল হতে সঙ্কেত মিলেছে। বেজে উঠেছে সাইরেন। জল নেমে আসার আগেই নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গিয়েছেন বাসিন্দারা। হড়পা বানের শক্তি এতটাই ছিল যে এক লহমায় ধুয়েমুছে সাফ হয়েছে উষ্ণ প্রস্রবণ, সড়ক, গবাদিপশু, ঘরবাড়ি। ভুটান সরকারের তরফে গতকাল রাতেই পশ্চিমবঙ্গ ও অসম রাজ্য প্রশাসনকে সতর্ক করা হয়। ভুটানে বৃষ্টির জল নদীপথে নেমে আসে ডুয়ার্সে। বন্যার আশঙ্কায় কুমারগ্রাম, বানারহাট ও ময়নাগুড়িতে সতর্কতা জারি করে প্রশাসন। আলিপুরদুয়ার জেলার নদী সংলগ্ন এলাকা থেকে অন্তত ১২ হাজার মানুষকে তড়িঘড়ি নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বিপুল জলরাশি বিকট শব্দে পাথর, মাটি, গাছগাছালি উপড়ে ভাসিয়ে নিচে গাসা জেলায় ঝাপিয়ে পড়ে ‘মো চু’ নদীতে নামে। গাসা ও পুনাখাকে বিধ্বস্ত করে। ভুটান প্রশাসনের তরফে জল নামার আগেই সাইরেন বাজিয়ে নদী তীরবর্তী ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ায় প্রাণহানির খবর না পাওয়া গেলেও লণ্ডভণ্ড হয়েছে বিস্তীর্ণ এলাকা। রাস্তা ধসে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে উত্তর ভুটানের বিভিন্ন জনপদ। ডুয়ার্সের সংকোশ এবং জলঢাকা নদী সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদেরও নিরাপদ এলাকায় সরানো হয়েছে। যদিও ওই দুই নদীর জলস্তর শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত স্বাভাবিক রয়েছে। কিন্তু বিপদ কাটেনি।

ভুটান প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, সিনতাপু হ্রদের জলে ভেসে আসা কাঠ, পাথর, মাটি নেমে লুনানা ও গাংচেন তাগ নদীর মিলনস্থলে তাকতসেমাথাং-এ আটকে কৃত্রিম হ্রদ তৈরি হয়েছে। প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে ওই জল আচমকা নেমে এলে বিপদ দেখা দিতে পারে। ওই কারণে নদী উপত্যকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। ভুটান হিমবাহ হ্রদ বিপর্যয় থেকে প্রাণহানি ঠেকাতে সফল হওয়ায় ভূ-গবেষক মহলের আলোচনায় উঠে এসেছে ওই দেশের হ্রদ বিপর্যয় ও হড়পা বানের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা। চোপড়া কলেজের অধ্যক্ষ তথা ভূ-গবেষক মধুসূদন কর্মকার বলেন, “ভুটান বিপর্যয় এড়াতে বিভিন্ন পদ্ধতি পরীক্ষা করে দেখছে। লুনানার থোরথোরমি হ্রদে সম্প্রতি এমন একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে যেখানে সাইফন পদ্ধতি ব্যবহার করে নিয়ন্ত্রিত উপায়ে হ্রদের জলস্তর কমিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাই ওই দেশ বিপদ এড়াতে সফল হয়েছে।” এদিন রাত পর্যন্ত ভুটানে কোনও সাধারণ মানুষের প্রাণহানির খবর আসেনি। যদিও প্রচুর সংখ্যায় গবাদি পশু জলস্রোতে ভেসে গিয়েছে বলে খবর।

জানা গিয়েছে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় উত্তর ভুটানের গাসা জেলার ওয়াকিলা পাহাড়ের নিচে থাকা সিনতাপু হ্রদ উপচে প্রায় ৭৪ লক্ষ ঘনমিটার জল মো চু নদীতে নেমেছে। ভুটানের ‘ন্যাশনাল সেন্টার ফর হাইড্রোলজি অ্যান্ড মেটিওরোলজি’ সূত্রে জানা গিয়েছে, ভুটানের ১৭টি বিপজ্জনক হিমবাহ হ্রদের মধ্যে সিনতাপু অন্যতম। ভুটানের বিশেষজ্ঞরা ২০২৩ সালের মে থেকে জুন মাসের মধ্যে এই হ্রদটি নিয়ে গবেষণা চালান। সিনতাপু থেকে আসা জল ‘মো চু’ নদীতে পড়ে গাসা ও পুনাখা হয়ে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়। পুনাখাতে ‘মো চু’ নদী ‘ফো চু’ নদীর সঙ্গে মিলিত হয়ে ‘পুনাৎসাংচু’ নাম ধারণ করে। এই নদী ভারতে প্রবেশ করে ‘সঙ্কোশ’ নদী হিসেবে পরিচিত। ওই কারণে পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম সরকারকে সতর্ক করে ভুটান সরকার।
নেপালের হড়পা বানের পর ভুটানের হিমবাহ হ্রদগুলির দিকে নজরদারি বাড়ানো হয়েছিল। ভুটানে মোট ১৭টি বিপজ্জনক হিমবাহ হ্রদ রয়েছে বলে খবর। সেইসব হ্রদের জল কমাতে পরীক্ষামূলকভাবে ‘সাইফনিং’ পদ্ধতিতে কাজ শুরু হয়েছে। ‘ভুটান ন্যাশনাল সেন্টার ফর হাইড্রোলজি অ্যান্ড মেটিওরোলজি’ এই কাজ করছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন এই সাফল্য হিমবাহ হ্রদের কৃত্রিম বাঁধ ভেঙে বিধ্বংসী হড়পা বানের ঝুঁকি এড়াতে বড় পদক্ষেপ। যদিও সেই প্রক্রিয়া চলার মধ্যেই ভুটানে সিনতাপু হ্রদের দেওয়াল ফেটে যায়। কতটা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, সেই বিষয়ে কাজ চালাচ্ছে প্রশাসন।
শেয়ার
লিংক



