একদিনে সোনা ৪,৩৪৭, রুপো ১০,৫৭৭ টাকা সস্তা, কেন এই পতন?

মুম্বই: আন্তর্জাতিক বাজারে একের পর এক প্রতিকূল পরিস্থিতির জেরে বড়সড় ধাক্কা খেল সোনা ও রুপোর দাম (Gold Silver Price)। নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে পরিচিত এই দুই মূল্যবান ধাতুর দর দ্রুত কমে যাওয়ায় উদ্বেগে বিনিয়োগকারীরা। শুক্রবার মাল্টি কমোডিটি এক্সচেঞ্জ (MCX)-এ প্রতি কেজি রুপোর দাম কমেছে ১০,৫৭৭ টাকা। অন্যদিকে, প্রতি ১০ গ্রাম সোনার দাম পড়েছে ৪,৩৪৭ টাকা।
MCX-এর তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার লেনদেনের শেষ পর্যায়ে সোনার ফিউচার্সের দাম নেমে আসে প্রতি ১০ গ্রামে ১,৩৮,৪১৯ টাকায়। রুপোর দর কমে দাঁড়ায় প্রতি কেজিতে ১,৭৮,৯০০ টাকা। এই পতনের ফলে ২০২৬ সালে রুপোর সবচেয়ে বড় মাসিক দরপতনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, সোনার দামও মার্চের শেষ দিকের পর সর্বনিম্ন স্তরে পৌঁছেছে।
গত বছর থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত সোনা ও রুপোর দামে জোরালো উত্থান দেখা গিয়েছিল। কিন্তু তার পর থেকেই একাধিক আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও আর্থিক কারণ মূল্যবান ধাতুর বাজারে চাপ তৈরি করেছে।
কেন হঠাৎ কমছে সোনা ও রুপোর দাম?
PTI-এর একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের কড়া অবস্থান সোনা ও রুপোর দামে পতনের অন্যতম কারণ। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ায় মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর ফলে সুদের হার দ্রুত কমানোর সম্ভাবনা দুর্বল হয়েছে।
মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের কড়া বা হকিশ অবস্থানের অর্থ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক সুদের হার দীর্ঘ সময় উঁচুতে রাখতে পারে। এমনকি ডিসেম্বর মাসে সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
সাধারণত সুদের হার বেশি থাকলে সোনার মতো এমন সম্পদের আকর্ষণ কমে, যেখান থেকে নিয়মিত সুদ বা আয় পাওয়া যায় না। কারণ, বিনিয়োগকারীরা তখন তুলনামূলক বেশি রিটার্ন দিতে পারে এমন সম্পদের দিকে ঝুঁকতে পারেন। ফলে সোনা ও রুপোর বাজারে বিক্রির চাপ তৈরি হয়েছে।
শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারেও সোনার দামে বড় পতন দেখা যায়। স্পট গোল্ডের দাম আউন্সপ্রতি ১৪৫.৮৪ ডলার বা প্রায় ৪ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ৩,৮৭৫.৫৫ ডলারে। এক বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে এটি ছিল সোনার সর্বনিম্ন স্তর। এর আগে ২০২৫ সালের ৩ অক্টোবর সোনার দাম আউন্সপ্রতি ৩,৮৮৭.০৯ ডলারের কাছাকাছি ছিল।
স্পট সিলভারের দামও আউন্সপ্রতি ৩.০৪ ডলার বা প্রায় ৬ শতাংশ কমে ৪৯.১২ ডলারে নেমে আসে। এর আগে ২০২৫ সালের ৬ নভেম্বর রুপোর দাম ৪৮.০২ ডলারে নেমেছিল।
শেয়ারবাজারের ধাক্কাতেও বাড়ল বিক্রির চাপ
সোনা ও রুপোর দরপতনের পিছনে আরও একটি কারণ হিসেবে উঠে এসেছে AI-নির্ভর প্রযুক্তি সংস্থার শেয়ার ঘিরে অস্থিরতা। AI-সম্পর্কিত শেয়ারে বড়সড় পতনের কারণে যেসব বিনিয়োগকারী ক্ষতির মুখে পড়েছেন, তাঁদের একাংশ নগদ অর্থ জোগাড় করতে অন্য সম্পদ বিক্রি করে থাকতে পারেন বলে PTI-র রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে রুপোর উপর চাপ আরও বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ, সোনার তুলনায় রুপোর শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহার অনেক বেশি। সৌর প্যানেল, ইলেকট্রনিক্স-সহ বিভিন্ন শিল্পে রুপোর চাহিদা রয়েছে। ফলে শিল্পক্ষেত্রের অনিশ্চয়তা বা বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি কমানোর প্রবণতা রুপোর দামে তুলনামূলক বেশি প্রভাব ফেলতে পারে।
চিনেও কিছু বিনিয়োগকারী নগদ অর্থ সংগ্রহের জন্য সোনা বিক্রি করছেন বলে রিপোর্টে সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। তবে এই কারণটি নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়।
নভেম্বরেই কি ঘুরে দাঁড়াতে পারে সোনার বাজার?
দামের এই বড় পতনের মধ্যেও ভারতের বাজারে কিছুটা আশার জায়গা রয়েছে। PTI-র রিপোর্ট অনুযায়ী, নভেম্বর মাসে উৎসব এবং বিয়ের মরসুমে সোনার চাহিদা বাড়তে পারে। ভারতে উৎসবের সময় বহু পরিবার গয়না, সোনার কয়েন এবং বার কেনেন। ঐতিহ্যগতভাবে ধনতেরস ও অক্ষয় তৃতীয়ার মতো দিনে সোনা কেনাকে শুভ বলে মনে করা হয়।
২০২৬ সালে ধনতেরস পড়েছে ৬ নভেম্বর। ফলে এই সময় খুচরো বাজারে সোনার কেনাকাটা বাড়লে দামের উপর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এ ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলির নিয়মিত সোনা কেনা আন্তর্জাতিক বাজারে দামের জন্য সহায়ক হতে পারে। অন্যদিকে, সৌর প্যানেল ও ইলেকট্রনিক্স শিল্পে রুপোর ব্যবহার ভবিষ্যতে চাহিদা ধরে রাখতে পারে। তবে শিল্পক্ষেত্রের চাহিদার উপর নির্ভরশীল হওয়ায় রুপোর দামে ওঠানামার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি থাকতে পারে।
রেকর্ড দর থেকে কতটা কমেছে সোনা ও রুপো?
চলতি বছরের জানুয়ারিতে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছিল সোনা ও রুপোর দাম। তার পর থেকে দুই ধাতুর দরেই বড়সড় সংশোধন হয়েছে।
জানুয়ারিতে রুপোর দাম প্রতি কেজিতে ৪,২০,০৪৮ টাকায় পৌঁছেছিল। সেখান থেকে দর কমে যাওয়ায় রুপো তার সর্বোচ্চ মূল্যের ৫০ শতাংশেরও বেশি হারিয়েছে। উল্লেখ্য, ২০২৫ সালে রুপোর দাম প্রায় ১৭০ শতাংশ বেড়েছিল।
সোনার ক্ষেত্রেও পতন কম নয়। জানুয়ারিতে প্রতি ১০ গ্রাম সোনার রেকর্ড দাম ছিল ১,৮০,৭৭৯ টাকা। সেখান থেকে দাম কমেছে ৪২,৩২১ টাকা।
সাধারণত মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে সুরক্ষা এবং ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়ে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনাকে গুরুত্ব দেন বিনিয়োগকারীরা। কিন্তু সুদের হার বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হলে সুদবিহীন এই সম্পদের আকর্ষণ কমতে পারে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে সেই কারণেই সোনা ও রুপোর দামে চাপ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকেরা। তবে ভারতের উৎসব ও বিয়ের মরসুমের চাহিদা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলির সোনা কেনা আগামী দিনে বাজারকে কতটা সমর্থন জোগায়, সেটাই এখন নজরে।
Essential Business Intelligence, Sharp Market Insights, Practical Personal Finance Advice, Daily Fuel, Gold and Silver Prices and Latest Stories – On Kolkata24x7 Business



