0%

মধ্যবর্তী ভোটে ট্রাম্পকে বড় ধাক্কা, মার্কিন কংগ্রেসের দুই কক্ষই ডেমোক্র্যাটদের দখলে

ওয়াশিংটন, ৪ নভেম্বর: মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির জন্য বড় ধাক্কা। মঙ্গলবারের নির্বাচনে কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে শাসক দল। সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়েছে বিরোধী ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। এর ফলে ট্রাম্পের দ্বিতীয় দফার প্রেসিডেন্সির বাকি দুই বছরে প্রশাসনের সামনে নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হল।

বুধবার পাওয়া প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী, ১০০ সদস্যের সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের আসনসংখ্যা ৫৪। এর মধ্যে দু’জন স্বতন্ত্র সদস্য রয়েছেন, যাঁরা ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে অবস্থান করেন। রিপাবলিকানদের আসন ৪৪। মোট ৩৫টি আসনে নির্বাচন হলেও বুধবার পর্যন্ত ৩৩টির ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে।

প্রতিনিধি পরিষদের ছবিটিও একই রকম। ৪৩৫ সদস্যের নিম্নকক্ষে ডেমোক্র্যাটরা পেয়েছে ২২৮টি আসন। রিপাবলিকানদের আসনসংখ্যা ১৩৯। বাকি আসনগুলির গণনা তখনও চলছিল। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ২১৮টি আসন। ফলে দুই কক্ষেই ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা কার্যত নিশ্চিত হয়েছে।

নির্বাচনের ফলাফলে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, যে সব রাজ্যে রিপাবলিকানদের দীর্ঘদিনের শক্তিশালী অবস্থান ছিল, সেখানেও এবার ডেমোক্র্যাটরা সাফল্য পেয়েছে। টেক্সাস, কানসাস, আইওয়া, ওহাইও, মেইন এবং দুই ক্যারোলাইনা রাজ্যের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আসনে জয় পেয়েছে তারা। বিশেষ করে কানসাসে প্রায় এক শতাব্দী পর ডেমোক্র্যাটদের সিনেট আসন জয় এবং টেক্সাসে দলের সাফল্য নির্বাচনের রাজনৈতিক গুরুত্ব বাড়িয়েছে।

উত্তর ক্যারোলাইনায় প্রাক্তন গভর্নর রয় কুপারের জয় এবং মেইনে দীর্ঘদিনের রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্সের পরাজয়ও উল্লেখযোগ্য। এসব ফলাফল থেকে স্পষ্ট, এবারের নির্বাচনে শুধু প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাজ্যেই নয়, রিপাবলিকানদের ঐতিহ্যগত ভোটব্যাঙ্কেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে।

কেন এই ফল? নির্বাচনী প্রচারে জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানির দাম এবং ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন নীতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছিল। এর পাশাপাশি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এবং মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির দিক নিয়েও ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ ছিল। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থনৈতিক চাপ ও ইরান যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষ রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে জনমত গঠনে ভূমিকা রেখেছে।

এই ফলকে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি ভোটারদের অসন্তোষের প্রকাশ হিসেবেই দেখছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ। যদিও নির্বাচনের ফল নিয়ে ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া ছিল সংযত। তিনি পরাজয়কে ব্যক্তিগতভাবে তাঁর বিরুদ্ধে রায় বলে মানতে চাননি। একই সঙ্গে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহের কথাও জানিয়েছেন। তবে বিরোধীদের আনা কোনও বিল তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য না হলে ভেটো প্রয়োগের ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারেন বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন।

নতুন পরিস্থিতিতে হোয়াইট হাউসের সঙ্গে কংগ্রেসের সংঘাত বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ হাতে থাকায় ডেমোক্র্যাটরা প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত, সরকারি ব্যয় এবং নীতিগত পদক্ষেপ নিয়ে তদন্ত ও শুনানির উদ্যোগ নিতে পারবে। সিনেটের নিয়ন্ত্রণও তাদের হাতে আসায় প্রশাসনিক ও বিচার বিভাগীয় পদে প্রেসিডেন্টের মনোনীত ব্যক্তিদের অনুমোদনের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে যাবে।

বিশেষ করে অভিবাসন, বাণিজ্যনীতি, স্বাস্থ্যসেবা, সরকারি ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে দুই দলের মধ্যে মতবিরোধ আরও প্রকাশ্যে আসতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি এবং ইরান-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েও কংগ্রেসে প্রশ্ন উঠতে পারে।

প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফরিসের নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হতে চলেছে। অন্যদিকে, রিপাবলিকানদের নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর বর্তমান স্পিকার মাইক জনসনের দলীয় নেতৃত্বে থাকার বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। দলের অভ্যন্তরে নেতৃত্ব পরিবর্তনের আলোচনা শুরু হয়েছে বলেও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

এই নির্বাচনে কয়েকটি ঐতিহাসিক ঘটনাও ঘটেছে। মিশিগান থেকে আবদুল এল-সায়েদ সিনেট নির্বাচনে জয়ী হয়ে মার্কিন সিনেটে প্রথম মুসলিম সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। একই সঙ্গে বিভিন্ন রাজ্যে নতুন প্রজন্মের এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের জয় মার্কিন রাজনীতিতে প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নকে ফের আলোচনায় এনেছে।

ভারতের দৃষ্টিতেও নির্বাচনের ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ। ওয়াশিংটনের সঙ্গে নয়াদিল্লির সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাণিজ্য, শুল্ক, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, প্রযুক্তি এবং অভিবাসন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় এসব বিষয়ে মার্কিন আইনসভায় আলোচনা ও নজরদারি বাড়তে পারে। তবে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে প্রেসিডেন্টের গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে। ফলে নির্বাচনের ফলের ভিত্তিতে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে তাৎক্ষণিক কোনও বড় পরিবর্তন হবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর অবকাশ নেই।

প্রতি চার বছর অন্তর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও তার মাঝামাঝি সময়ে কংগ্রেসের এই নির্বাচন মার্কিন প্রশাসনের জনসমর্থনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হয়। ২০২৬ সালের নির্বাচনে সেই পরীক্ষায় ট্রাম্পের দল প্রত্যাশিত ফল করতে পারেনি।

নতুন কংগ্রেসের অধিবেশন শুরু হবে আগামী বছরের জানুয়ারিতে। তার আগে নির্বাচনের বাকি ফলাফল ঘোষণা এবং নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। তবে একটি বিষয় ইতিমধ্যেই স্পষ্ট—ট্রাম্প প্রশাসনের বাকি মেয়াদে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক সমীকরণ আর আগের মতো থাকছে না।

Related Articles

Back to top button

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker