এআইয়ের কথায় জীবনদায়ী ওষুধে দাঁড়ি! মার্কিন ইঞ্জিনিয়ারের পরিণতি দেখে সতর্ক হোন

রোগের লক্ষণ বুঝতে, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া জানতে বা চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এখন অনেকেই ভরসা করছেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) উপর। কিন্তু সেই ভরসাই কি কখনও প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে? মার্কিন এক তরুণীর মৃত্যুকে ঘিরে উঠেছে এমনই গুরুতর প্রশ্ন। পরিবারের অভিযোগ, চ্যাটজিপিটির পরামর্শ মেনে খিঁচুনি নিয়ন্ত্রণের ওষুধের মাত্রা কমিয়েছিলেন ৩১ বছরের বোয়েন ওয়ান। তার পরেই মৃত্যু হয় তাঁর। তরুণীর বাবা-মায়ের অভিযোগ, চিকিৎসকের অনুমতি ছাড়াই কীভাবে ওষুধ বন্ধ করতে হবে, তার বিস্তারিত পরিকল্পনা তৈরি করে দিয়েছিল চ্যাটবটটি।
কী ঘটেছিল বোয়েনের সঙ্গে?
সিয়াটলের বাসিন্দা সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার বোয়েন মৃগীরোগে আক্রান্ত ছিলেন। নিয়মিত যে মাত্রায় ওষুধ খেতেন, পরিবারের দায়ের করা মামলায় অভিযোগ, চ্যাটজিপিটি তাঁকে ২৫ দিনের একটি পরিকল্পনা দিয়েছিল। সেই অনুযায়ী ধাপে ধাপে ওষুধের মাত্রা কমিয়ে শূন্যে নামানোর কথা বলা হয়।
এমনকী, এই পরিকল্পনার কথা চিকিৎসকদের না জানানোর পরামর্শও দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ। গত ফেব্রুয়ারিতে মৃত্যু হয় বোয়েনের। কিং কাউন্টির মেডিক্যাল পরীক্ষকের রিপোর্টে মৃত্যুর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ‘সাডেন আনএক্সপেক্টেড ডেথ ইন এপিলেপসি’। অর্থাৎ, মৃগীরোগীর আকস্মিক অপ্রত্যাশিত মৃত্যু।
যদিও ওপেনএআই-এর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা এখনও আদালতে প্রমাণিত হয়নি। সংস্থার তরফে ঘটনাটিকে মর্মান্তিক বলে উল্লেখ করে জানানো হয়েছে, চিকিৎসার বিকল্প নয় চ্যাটজিপিটি।
মৃগীর ওষুধ বন্ধ করলেই কি ফিরতে পারে খিঁচুনি?
মৃগীরোগে মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপে অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়। তার ফলেই খিঁচুনি হয়। কিছু ওষুধ মস্তিষ্কের এই অস্বাভাবিক কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। নিয়মিত ওষুধ খেয়ে দীর্ঘদিন খিঁচুনি না হলেও তার অর্থ এই নয় যে রোগ সেরে গিয়েছে। নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধের মাত্রা কমালে বা বন্ধ করলে ফের খিঁচুনি শুরু হতে পারে। এমনকী, আগের তুলনায় বেড়ে যেতে পারে তার তীব্রতা। ওষুধ বন্ধ করা যাবে কি না, তা নির্ভর করে রোগের ধরন, খিঁচুনির ইতিহাস এবং রোগীর সামগ্রিক শারীরিক অবস্থার উপর।
পাঁচ মিনিটের খিঁচুনিও হতে পারে প্রাণঘাতী
একটানা পাঁচ মিনিট বা তার বেশি সময় খিঁচুনি চললে, অথবা পরপর খিঁচুনি হলেও মাঝখানে রোগীর চেতনা না ফিরলে তাকে বলে ‘স্টেটাস এপিলেপটিকাস’। এটি চিকিৎসার জরুরি পরিস্থিতি। দ্রুত চিকিৎসা না হলে মস্তিষ্কের ক্ষতি, এমনকী মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
মৃগীরোগীদের ক্ষেত্রে আরও একটি গুরুতর আশঙ্কা ‘সাডেন আনএক্সপেক্টেড ডেথ ইন এপিলেপসি’। এর প্রকৃত কারণ এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে ঘন ঘন তীব্র খিঁচুনি, বিশেষত জেনারালাইজড টনিক-ক্লোনিক সিজার, এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ। নিয়মিত ওষুধ খাওয়া এবং খিঁচুনি নিয়ন্ত্রণে রাখা এই আশঙ্কা কমানোর গুরুত্বপূর্ণ উপায়।

এআই-এর পরামর্শে ওষুধ বদলানো কেন বিপজ্জনক?
চ্যাটবট চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য দিতে পারে, কিন্তু রোগীর শারীরিক পরীক্ষা করতে পারে না। খিঁচুনির ইতিহাস, আগের চিকিৎসা, অন্যান্য ওষুধ এবং শারীরিক অবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিচার করার ক্ষমতাও চিকিৎসকের মতো নয়। ফলে তার উত্তর আত্মবিশ্বাসী শোনালেও তা নিরাপদ নাও হতে পারে।
ওষুধে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলে কী করবেন?
ওষুধ খেয়ে সমস্যা হলে চিকিৎসককে জানান। প্রয়োজন অনুযায়ী তিনি মাত্রা বদলাতে পারেন, বিকল্প ওষুধ দিতে পারেন বা নতুন করে কিছু পরীক্ষা করাতে পারেন। কিন্তু নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ বন্ধ করা, ডোজ কমানো বা বাদ পড়া ওষুধের পরিবর্তে একসঙ্গে বেশি মাত্রা খাওয়া উচিত নয়। খিঁচুনি দীর্ঘক্ষণ চললে, পরপর খিঁচুনির পর চেতনা না ফিরলে বা শ্বাসকষ্ট হলে অবিলম্বে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।
বোয়েনের মৃত্যুকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের নিষ্পত্তি এখনও হয়নি। কিন্তু ঘটনাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা দিয়ে যাচ্ছে। এআই রোগ সম্পর্কে জানার মাধ্যম হতে পারে, চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেওয়ার নয়। বিশেষত মৃগীর মতো রোগে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধের মাত্রা বদলানো মানে নিজের সুরক্ষাকবচ নিজেই সরিয়ে ফেলা।
শেয়ার
লিংক



