অপারেশন সিঁদুরের পর প্রতিরক্ষা উৎপাদনের নতুন কেন্দ্র নাগপুর! ৪৫০টি নাগাস্ত্র সেনার হাতে

নাগপুর: অপারেশন সিঁদুরের পর ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ( Nagastra)দেশীয় প্রযুক্তি ও অস্ত্র উৎপাদনের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। আধুনিক যুদ্ধে ড্রোন, নির্ভুল নিশানায় আঘাত হানার অস্ত্র এবং…
নাগপুর: অপারেশন সিঁদুরের পর ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ( Nagastra)দেশীয় প্রযুক্তি ও অস্ত্র উৎপাদনের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। আধুনিক যুদ্ধে ড্রোন, নির্ভুল নিশানায় আঘাত হানার অস্ত্র এবং দূরপাল্লার রকেটের ব্যবহার ক্রমশ বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে মহারাষ্ট্রের নাগপুর ভারতের প্রতিরক্ষা উৎপাদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে।
এখানকার সোলার ডিফেন্স অ্যান্ড অ্যারোস্পেস লিমিটেড একদিকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে দেশীয় নাগাস্ত্র-১ লয়টারিং মিউনিশনের প্রথম ৪৫০টি ইউনিট তুলে দিয়েছে, অন্যদিকে আর্মেনিয়ার জন্য ৭০০টি গাইডেড পিনাকা রকেট তৈরি করে রফতানির ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে।
আরও দেখুনঃ অগ্নিবীরদের চাকরির মেয়াদ ৪ থেকে বেড়ে ৬ বছর, বড় ঘোষণা কেন্দ্রের
২০২৫ সালে নাগপুরে সোলার ডিফেন্স অ্যান্ড অ্যারোস্পেস লিমিটেডের অস্ত্র ও গোলাবারুদ উৎপাদন কেন্দ্রের উদ্বোধন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তার এক বছরের মধ্যেই এই কারখানা থেকে প্রতিরক্ষা উৎপাদনে বড় অগ্রগতির খবর সামনে এসেছে। চলতি বছরের অক্টোবর মাসে ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে প্রথম দফায় ৪৫০টি নাগাস্ত্র-১ হস্তান্তর করেছে সংস্থাটি।
এই অস্ত্র ব্যবস্থাকে ভারতের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি আত্মঘাতী ড্রোন বা লয়টারিং মিউনিশন তৈরির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অপারেশন সিঁদুরের সময় পাকিস্তানের ভূখণ্ডে জঙ্গি পরিকাঠামো লক্ষ্য করে এই ধরনের দেশীয় প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়েও আলোচনা হয়েছিল।
নাগাস্ত্র-১ মূলত একটি অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক লয়টারিং মিউনিশন। ( Nagastra)সাধারণ নজরদারি ড্রোনের সঙ্গে এর পার্থক্য হল, এটি শুধু শত্রুপক্ষের গতিবিধির উপর নজর রাখে না, প্রয়োজন হলে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে সরাসরি আঘাত হানতেও সক্ষম। বিশেষ করে ট্যাঙ্ক এবং সাঁজোয়া সামরিক যান ধ্বংস করার জন্য এই প্রযুক্তি তৈরি করা হয়েছে।
মিশনের প্রয়োজন অনুযায়ী এটি দুটি পৃথক পদ্ধতিতে কাজ করতে পারে। পুনরায় ফিরিয়ে এনে ব্যবহারের উপযোগী মোডে এর কার্যকর পাল্লা প্রায় ২৫ কিলোমিটার। অন্যদিকে ফায়ার অ্যান্ড ফরগেট মোডে একমুখী আক্রমণ চালিয়ে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছতে পারে।
শুধু নাগাস্ত্র-১ নয়, এর উন্নত সংস্করণ নাগাস্ত্র-২ তৈরির কাজও এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সংস্থাটি। আধুনিক যুদ্ধে শত্রুপক্ষের তরফে জিপিএস জ্যামিং এবং যোগাযোগ ব্যবস্থায় বাধা তৈরি করা বড় সমস্যা। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় নাগাস্ত্র-২-তে ইলেকট্রনিক কাউন্টার-কাউন্টারমেজার বা ECCM প্রযুক্তি যুক্ত করা হয়েছে বলে সংস্থার দাবি।
এর ফলে জিপিএস সিগন্যাল জ্যামিং বা স্পুফিংয়ের মতো বাধার মধ্যেও ড্রোনটির লক্ষ্য নির্ধারণের সক্ষমতা বজায় রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। এর আগে সেনাবাহিনীর জন্য ৪৫০টি নাগাস্ত্র-১আর তৈরির বরাতও পেয়েছিল সংস্থাটি। লাদাখ থেকে বাবিনা পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় এই প্রযুক্তির পরীক্ষা চালানো হয়েছে।
নাগপুরের প্রতিরক্ষা উৎপাদনের দ্বিতীয় বড় সাফল্য পিনাকা রকেট। প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা বা ডিআরডিও-র তৈরি এই মাল্টি-ব্যারেল রকেট লঞ্চার ব্যবস্থা ভারতীয় সেনাবাহিনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র। অল্প সময়ে পরপর একাধিক রকেট ছুড়ে শত্রুপক্ষের ঘাঁটি, বাঙ্কার এবং সামরিক অবস্থানে আঘাত হানতে পারে পিনাকা।
আগে মূলত সরকারি প্রতিরক্ষা উৎপাদন সংস্থাগুলির মাধ্যমে এই রকেট তৈরি হলেও বর্তমানে বেসরকারি সংস্থাগুলিও উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছে। সোলার ডিফেন্স অ্যান্ড অ্যারোস্পেস এই ক্ষেত্রেও প্রায় ৬,০০০ কোটি টাকার বরাত পেয়েছে।
সময়ের সঙ্গে পিনাকা রকেটের পাল্লা ও নির্ভুলতা বাড়ানো হয়েছে। প্রথম দিকের সংস্করণের পাল্লা ছিল প্রায় ৩৭.৫ কিলোমিটার। পরবর্তী উন্নত সংস্করণে তা বেড়ে ৪৫ কিলোমিটার এবং ৭৫ কিলোমিটারের বেশি হয়েছে। পিনাকা এমকে-১ এনহ্যান্সড সফল পরীক্ষার পর ২০২২ সালে সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হয়। বর্তমানে গাইডেড পিনাকার উন্নত সংস্করণ প্রায় ১২০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম বলে জানানো হয়েছে। এর উন্নত গাইডেন্স, নেভিগেশন ও কন্ট্রোল প্রযুক্তি লক্ষ্যভেদের নির্ভুলতা বাড়াতে সাহায্য করে।
দেশীয় প্রতিরক্ষা উৎপাদনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও পিনাকার চাহিদা তৈরি হচ্ছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং নাগপুরের কারখানা থেকে আর্মেনিয়ার স্থলবাহিনীর জন্য প্রথম দফার ৭০০টি গাইডেড পিনাকা রকেট রফতানির সূচনা করেন।
ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পের কাছে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ( Nagastra)কারণ, দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি একটি অস্ত্র ব্যবস্থা এবার বিদেশের সেনাবাহিনীর প্রয়োজন মেটাতেও ব্যবহৃত হচ্ছে। সংস্থার দাবি, পিনাকার তুলনামূলক কম খরচ, নির্ভুল আঘাত হানার ক্ষমতা এবং কার্যকারিতার কারণে আরও কয়েকটি দেশ এই অস্ত্র কেনার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে।
পিনাকার উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়াতে প্রতিরক্ষা মন্ত্রকও বড় অঙ্কের বরাত দিয়েছে। সোলার ইন্ডাস্ট্রিজ এবং মিউনিশনস ইন্ডিয়া লিমিটেডের সঙ্গে ১০,২০০ কোটি টাকার বেশি মূল্যের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর ফলে দেশীয় উৎপাদন ব্যবস্থার পাশাপাশি সেনাবাহিনীর রকেট আর্টিলারি সক্ষমতাও শক্তিশালী হবে বলে আশা করা হচ্ছে।



