0%

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ধাক্কা রিপাবলিকানদের, ভোটারদের অনুপস্থিতিকেই দায়ী করলেন ট্রাম্প, পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি ডেমোক্র্যাটদের

ওয়াশিংটন, ৪ নভেম্বর : মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে (মিডটার্ম) কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় তাঁদের অভিনন্দন জানালেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে রিপাবলিকানদের নির্বাচনী বিপর্যয়ের জন্য নিজের ব্যালটে না থাকা এবং দলের সমর্থকদের ভোট দিতে না আসাকেই অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরেছেন তিনি। অন্যদিকে, নির্বাচনে সাফল্যের পর সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং ট্রাম্প প্রশাসনের কাজকর্মের উপর কঠোর নজরদারির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ডেমোক্র্যাট নেতারা।

মার্কিন রাজনীতিতে এই নির্বাচনের ফলে ওয়াশিংটনের ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আসতে চলেছে। আগামী ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে প্রতিনিধি পরিষদ এবং সেনেট—উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেছে ডেমোক্র্যাটরা। অন্যদিকে, নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর রিপাবলিকান নেতৃত্ব ও দলের নির্বাচনী কৌশল নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

নির্বাচনের রাতে সিবিএস নিউজকে টেলিফোনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, “ডেমোক্র্যাটদের অভিনন্দন জানাই। দেশের স্বার্থে তাঁদের সঙ্গে কাজ করার জন্য আমি আগ্রহী।”

তবে একইসঙ্গে তিনি দাবি করেন, নিজে প্রার্থী হলে রিপাবলিকানদের ফল আরও ভালো হতে পারত। তাঁর মতে, দলের অনেক সমর্থক ভোট দিতে আসেননি এবং কয়েকজন প্রার্থীর প্রতি অসন্তোষও পরাজয়ের অন্যতম কারণ। রিপাবলিকান প্রার্থীদের জেতাতে তিনি যথেষ্ট পরিশ্রম করেছেন বলেও দাবি করেন ট্রাম্প। তবে সেই প্রচেষ্টা নির্বাচনী সাফল্যে পরিণত হয়নি বলে স্বীকার করেন তিনি।

এদিকে, ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাব্য জয়কে বড় রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন সেনেটে দলের নেতা চাক শুমার। বুধবার ওয়াশিংটনে এক সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি বলেন, “সব প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে আমরা ডেমোক্র্যাটরা সেনেটের নিয়ন্ত্রণ পেয়েছি।”

আমেরিকার জনগণের উদ্দেশে তিনি বলেন, “স্বস্তি আসছে।” শুমারের মতে, পরিবারের ক্রমবর্ধমান খরচ, স্বাস্থ্য পরিষেবার ব্যয় এবং বর্তমান প্রশাসনের প্রতি জনঅসন্তোষই ডেমোক্র্যাটদের জয়ের অন্যতম কারণ।

তাঁর অভিযোগ, আমেরিকার সাধারণ পরিবারগুলি যখন অর্থনৈতিক সমস্যার মুখোমুখি, তখনও রিপাবলিকানরা ট্রাম্পের রাজনৈতিক কর্মসূচিকেই অগ্রাধিকার দিয়েছে। অন্যদিকে, ভোটারদের সমস্যার কথা শুনে এবং ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকান-প্রভাবিত রাজ্যগুলিতেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে সক্ষম প্রার্থী বেছে নিয়েই ডেমোক্র্যাটরা সাফল্য পেয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফ্রিস, যিনি আমেরিকার ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ স্পিকার হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছেন, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং সরকারি প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

ওয়াশিংটনে দলের নির্বাচনী সমাবেশে জেফ্রিস বলেন, “এই নির্বাচন পরিবর্তনের নির্বাচন।” তিনি বাড়ি ভাড়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী এবং জ্বালানির দাম কমানোর উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। পাশাপাশি স্বাস্থ্য পরিষেবার সুরক্ষা ফিরিয়ে আনা এবং প্রশাসনের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের কথাও জানান।

ডেমোক্র্যাটদের নতুন সংখ্যাগরিষ্ঠতা ব্যবহার করে প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও কার্যকলাপের উপর কংগ্রেসের নজরদারি বাড়ানো হবে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।

ডেমোক্র্যাটিক ন্যাশনাল কমিটির চেয়ারম্যান কেন মার্টিনও এই ফলাফলকে জনসমর্থনের ম্যান্ডেট হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, জীবনযাত্রার ব্যয়, স্বাস্থ্য পরিষেবা, অভিবাসন এবং সরকারি প্রশাসনের জবাবদিহির মতো বিষয়গুলিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ভোটাররা। পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ পরিচালনার বিষয়েও বিরোধিতা চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।

অন্যদিকে, রিপাবলিকান নেতারা নির্বাচনী ফলাফলের ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসন দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর বিষয়টি স্বীকার করলেও বলেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনে সাধারণত ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল আসন হারায়। তাই রিপাবলিকানদের জন্য এই নির্বাচন শুরু থেকেই কঠিন ছিল।

লুইজিয়ানার শ্রিভপোর্টে দলীয় সমর্থকদের উদ্দেশে জনসন বলেন, এই পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠা অত্যন্ত কঠিন। তাঁর মতে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের আসন হারানোর ঐতিহাসিক প্রবণতাই এবারও বজায় থাকল।

কংগ্রেসের নজরদারিকে রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করার জন্য ডেমোক্র্যাটদের সতর্ক করেছেন জনসন। একইসঙ্গে রিপাবলিকানদের আইন প্রণয়ন সংক্রান্ত অগ্রাধিকারের বিষয়গুলি রক্ষা করার কথাও জানিয়েছেন তিনি।

সেনেটে রিপাবলিকান নেতা জন থুনও দলের কাজের পক্ষে সওয়াল করেছেন। করনীতি, সীমান্ত নিরাপত্তা, বিচারপতি নিয়োগ এবং অর্থনৈতিক পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে তিনি দাবি করেন, নির্বাচনী পরাজয় সত্ত্বেও রিপাবলিকানদের আইন প্রণয়নের রেকর্ড যথেষ্ট শক্তিশালী।

নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর রিপাবলিকান শিবিরে নেতৃত্ব পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। পলিটিকোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, রিপাবলিকান সাংসদ রালফ নরম্যান এই ফলাফলকে রক্ষণশীল শিবিরের জন্য সতর্কবার্তা বলে উল্লেখ করেছেন। আগামী সপ্তাহে দলের নেতৃত্ব নির্বাচন হওয়ার কথা। ফলে মাইক জনসনের অবস্থান এবং দলের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে নজর থাকবে রাজনৈতিক মহলের।

উল্লেখ্য, ৩ নভেম্বরের নির্বাচনের আগে হোয়াইট হাউস, প্রতিনিধি পরিষদ এবং সেনেট—তিনটিরই নিয়ন্ত্রণ ছিল রিপাবলিকানদের হাতে। ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাব্য জয়ের ফলে ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে নতুন কংগ্রেসের অধিবেশন শুরু হলে আমেরিকায় বিভক্ত শাসনব্যবস্থা (ডিভাইডেড গভর্নমেন্ট) তৈরি হবে। এর ফলে কংগ্রেসের কমিটি, তদন্ত এবং আইন প্রণয়নের সময়সূচির উপর ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ থাকবে। তবে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের হাতে নির্বাহী ক্ষমতা এবং ভেটো দেওয়ার সাংবিধানিক অধিকার বহাল থাকবে।

— আইএএনএস (IANS)

Related Articles

Back to top button

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker