নকশাল দমনে দৃঢ় নীতি ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার ফল, অস্ত্রধারী নকশালদের পর এবার ‘মগজধোলাইকারী নকশাল’দের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ডাক মোদির

জগদলপুর/রায়পুর (ছত্তিশগড়), ৮ নভেম্বর : নকশালবাদ ও মাওবাদী হিংসা দমনে কেন্দ্রীয় সরকারের দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সঠিক নীতি এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সাহসিকতাকে সাফল্যের প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। রবিবার দীপাবলি উপলক্ষে ছত্তিশগড়ের বস্তারে নিরাপত্তা বাহিনীর জওয়ানদের সঙ্গে সময় কাটিয়ে তিনি বলেন, সঠিক উদ্দেশ্যের পাশাপাশি কার্যকর নীতিগত সিদ্ধান্তের ফলেই দেশে নকশালবাদের প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হয়েছে। তবে সশস্ত্র নকশালবাদ দুর্বল হলেও আদর্শগতভাবে নকশালপন্থী বা ‘দিমাগি নকশাল’দের প্রভাব এখনও রয়েছে বলে সতর্ক করেন তিনি। তাঁর মতে, দেশের সংবিধান ও গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে যারা মানুষকে প্ররোচিত করছে, তাদের চিহ্নিত করে মোকাবিলা করতে হবে।
বস্তারে নিরাপত্তা বাহিনীর উদ্দেশে ভাষণ দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে সরকার একাধিক কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি পদক্ষেপ সম্পর্কে সাধারণ মানুষ এখনও অবগত নন। এই সিদ্ধান্তগুলির ফলে নকশাল ও বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলির অর্থের জোগান দেওয়ার নেটওয়ার্কে বড় আঘাত লেগেছে। জাল নোটের কারবারের নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়ার ফলে তাদের আর্থিক শক্তি দুর্বল হয়েছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থাও ব্যাহত হয়েছে। এর জেরে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি নকশালদের যাতায়াত ও নতুন সদস্য সংগ্রহের ক্ষেত্রেও বাধা সৃষ্টি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
নকশাল দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর দীর্ঘদিনের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে মোদি বলেন, কয়েক দশক ধরে এই অঞ্চলের মাটি সাহসী জওয়ানদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে। বছরের পর বছর প্রায় প্রতিদিনই হামলার ঘটনা ঘটেছে। শুধুমাত্র ছত্তিশগড়েই এক হাজারের বেশি নিরাপত্তাকর্মী শহিদ হয়েছেন। অথচ সেই সময় দেশের প্রভাবশালী নেতাদের অনেকেই নিরাপত্তা বাহিনীর আত্মত্যাগের প্রতি যথাযথ সহানুভূতি দেখাননি বলে অভিযোগ করেন প্রধানমন্ত্রী।
২০০৪ থেকে ২০১৩ সালের পরিসংখ্যানের উল্লেখ করে তিনি বলেন, ওই সময়ে প্রতি বছর নকশালদের তুলনায় নিরাপত্তা বাহিনীর বেশি সদস্যের মৃত্যু হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, আগের সরকারগুলি নকশালবাদকে এমন একটি সমস্যার মতো দেখেছিল, যার কোনও সমাধান নেই। ফলে সমস্যাটিকে মোকাবিলা করার পরিবর্তে কার্যত উপেক্ষা করা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোনও দেশ যদি ধরে নেয় যে পরিস্থিতি যেমন রয়েছে তেমনই থাকবে এবং শত্রুদের মোকাবিলা করা সম্ভব নয়, তাহলে সেই দেশ কখনও এগিয়ে যেতে পারে না।
নকশালবাদের বিরুদ্ধে লড়াই যে সহজ ছিল না, তাও উল্লেখ করেন মোদি। তাঁর বক্তব্য, একসময় নকশালরা সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার পর্যন্ত কেড়ে নিয়েছিল। বছরে হামলার সংখ্যা প্রায় দুই হাজারে পৌঁছেছিল। ২০১০ সালে দান্তেওয়াড়ায় এক সংঘর্ষে ৭৬ জন সিআরপিএফ জওয়ান শহিদ হন। একই বছরে অন্য একটি ঘটনায় ৪৪ জন নিরীহ নাগরিক প্রাণ হারান। এই পরিস্থিতির পরিবর্তন শুরু হয় ২০১৪ সালের পর, যখন দেশের মানুষ তাঁকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী জানান, গত ৪৭ বছরের মধ্যে গত বছর একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত হয়েছে। তাঁর দাবি, গত এক বছরে দায়িত্ব পালনকালে কোনও সিআরপিএফ জওয়ান শহিদ হননি। এই সাফল্যকে সরকারের সঠিক নীতি, দৃঢ় সংকল্প এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সাহস, বীরত্ব ও সংযমের ফল বলে উল্লেখ করেন তিনি।
এদিন ছত্তিশগড়ের বস্তার জেলার করণপুরে কোবরা অপারেশনস বেসেও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে তিনি বলেন, দেশের অগ্রগতির পথে শত্রুদের মোকাবিলা করতে হলে অটল সংকল্প এবং সুপরিকল্পিত কৌশল প্রয়োজন। ২০১৪ সালের আগে এই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে যে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব ছিল, তাঁর সরকার তা শক্তিশালী করেছে।
মোদি অভিযোগ করেন, আগের সরকারগুলির আমলে নকশাল হামলার মুখে পড়লেও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের অনেক সময় কার্যকরভাবে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার পর্যাপ্ত স্বাধীনতা ছিল না। মাটির পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁদের ক্ষমতা সীমিত রাখা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান এনডিএ সরকার নিরাপত্তা বাহিনীকে অভিযান চলাকালীন প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিজেরাই নেওয়ার স্বাধীনতা দিয়েছে। পাশাপাশি প্রশাসন ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাওবাদী কার্যকলাপের প্রতি কোনও ধরনের সমর্থন যাতে না থাকে, সেই ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, নকশালবাদের বিরুদ্ধে লড়াই শুধুমাত্র নিরাপত্তা অভিযান চালানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এর পাশাপাশি নকশাল প্রভাবিত এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার উন্নয়নেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কোনও নিরীহ মানুষ যাতে মাওবাদী হিংসার কারণে প্রাণ না হারান কিংবা ভবিষ্যৎ নষ্ট না হয়, সেটাই ছিল সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।
এদিন নকশাল প্রভাবিত এলাকায় উন্নয়নমূলক কাজের খতিয়ান তুলে ধরে মোদি জানান, নিরাপত্তা বাহিনীর সুরক্ষায় ১৫ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে। ৯ হাজারের বেশি মোবাইল টাওয়ার স্থাপন করা হয়েছে। আদিবাসী শিশুদের শিক্ষার জন্য প্রায় ২০০টি একলব্য মডেল স্কুল চালু হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ৫০টি আইটিআই এবং দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। হাজার হাজার ডাকঘর, ব্যাঙ্কের শাখা এবং এটিএম স্থাপন করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, পিএম-জনমন প্রকল্পের মাধ্যমে প্রত্যন্ত আদিবাসী গ্রামগুলিতে প্রথমবারের মতো পানীয় জল, বিদ্যুৎ ও সড়ক যোগাযোগের ব্যবস্থা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। আত্মসমর্পণকারী নকশালদের পুনর্বাসনের সুযোগও দেওয়া হয়েছে। এই সমস্ত উদ্যোগের ফলে নকশাল প্রভাবিত এলাকাগুলিতে উন্নয়নের নতুন পথ খুলেছে বলে দাবি করেন প্রধানমন্ত্রী।
নকশালবাদ দমনের সঙ্গে দারিদ্র্য দূরীকরণের সম্পর্কও ব্যাখ্যা করেন মোদি। তাঁর বক্তব্য, নকশাল প্রভাবিত এলাকায় চরমপন্থীদের প্রথম লক্ষ্যই ছিল উন্নয়নমূলক কাজ আটকে দেওয়া। স্কুল খুলতে বাধা দেওয়া, স্কুলে আগুন লাগানো, হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের কাজ করতে না দেওয়া, ওষুধের দোকান বন্ধ রাখা, পোলিও টিকাকরণে বাধা দেওয়া, মোবাইল টাওয়ার ধ্বংস করা, রেললাইন উড়িয়ে দেওয়া এবং শিল্প স্থাপনে বাধা দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। এর ফলে বহু দরিদ্র পরিবার এবং তরুণ-তরুণী উন্নয়নের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
এই প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাঙ্কের সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনের উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী দাবি করেন, গত ১২ বছরে ভারতে প্রায় ৫০ কোটি মানুষ চরম দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছেন। তাঁর মতে, কয়েক দশক ধরে শুধুমাত্র ‘গরিবি হটাও’ স্লোগান দিয়ে যে সাফল্য পাওয়া যায়নি, বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের মাধ্যমে তা সম্ভব হয়েছে।
সরকারের বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রকল্পকে একটি রঙোলির সঙ্গে তুলনা করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, যেমন ছোট ছোট নকশা একত্রিত হয়ে একটি সুন্দর রঙোলি তৈরি করে, তেমনই একাধিক প্রকল্পের সম্মিলিত প্রভাব দরিদ্র মানুষের জীবনকে বদলে দিয়েছে। জনধন যোজনার মাধ্যমে কোটি কোটি মানুষকে ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার আওতায় আনা, প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনায় পাকা বাড়ি প্রদান, মুদ্রা প্রকল্পে জামানত ছাড়াই ঋণ, পিএম স্বনিধির মাধ্যমে পথবিক্রেতাদের আর্থিক সহায়তা এবং আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পে বিনামূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা করার কথা উল্লেখ করেন তিনি।
এছাড়াও বিনামূল্যে রেশন, শিক্ষা, ওষুধ ও রান্নার সুবিধা এবং স্বচ্ছ ভারত মিশন ও হর ঘর জল প্রকল্পের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
তবে সশস্ত্র নকশালবাদ দমনের সাফল্য সত্ত্বেও বিপদ সম্পূর্ণভাবে কেটে যায়নি বলে সতর্ক করেন মোদি। তাঁর বক্তব্য, জঙ্গলের মধ্যে অস্ত্রধারী নকশালদের প্রভাব শেষ হলেও বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আদর্শগত নকশালপন্থীদের প্রভাব রয়ে গিয়েছে। তিনি বলেন, “অস্ত্রধারী নকশালদের জঙ্গল থেকে নির্মূল করা হয়েছে। কিন্তু মগজধোলাইকারী নকশালরা এখনও বহু প্রতিষ্ঠানে প্রভাব বিস্তার করে রয়েছে। তারা দেশের সংবিধান ও গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে মানুষকে উসকে দিচ্ছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের মধ্যেও তাদের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। তাদের চিহ্নিত করতে হবে, মোকাবিলা করতে হবে এবং দেশকে সুরক্ষিত রাখতে হবে।”
এদিন প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, নকশালবাদ নির্মূল করাই দেশের চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। সামনে আরও দীর্ঘ পথ চলা বাকি রয়েছে। বস্তারে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় তিনি বলেন, বর্তমান সাফল্য আগামী দিনের আরও বড় লক্ষ্য অর্জনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। নকশালবাদ ও দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে পাওয়া সাফল্যকে তিনি নতুন ভারতের অগ্রযাত্রার সূচনা হিসেবে উল্লেখ করেন।
দেশের স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগ করা স্বাধীনতা সংগ্রামী, সীমান্তে দেশের নিরাপত্তায় প্রাণ দেওয়া সেনা জওয়ান এবং নকশাল ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শহিদ হওয়া নিরাপত্তাকর্মীদের স্বপ্ন পূরণের কথাও বলেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, এখন সময় এসেছে শুধু দেশের জন্য আত্মত্যাগ করার নয়, বরং দেশের উন্নয়নে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করার।
কাশ্মীরে ৩৭০ অনুচ্ছেদ বিলোপ, প্রতিটি বাড়িতে শৌচাগার নির্মাণ এবং দেশজুড়ে টিকাকরণ কর্মসূচির মতো উদাহরণ তুলে ধরে মোদি বলেন, দেশ একবার কোনও সংকল্প গ্রহণ করলে তা পূরণ করার ক্ষমতা রাখে। দারিদ্র্যমুক্ত ভারত, নেশামুক্ত ভারত, বিকশিত ভারত এবং আত্মনির্ভর ভারত গড়ার লক্ষ্যও পূরণ হবে বলে আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেন তিনি।
বস্তারে দীপাবলি উদযাপনের সময় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের উন্নয়নের ভিত গড়ে উঠছে তাঁদের আত্মত্যাগ, পরিশ্রম ও সাহসিকতার ওপর। জওয়ানদের উদ্দেশে দীপাবলির শুভেচ্ছা জানিয়ে তিনি তাঁদের অবদানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
—আইএএনএস



