বিশ্ববাজারে সোনার দাম কমেছে ২৪%, ভারতে পতন মাত্র ২০% কেন?

কলকাতা: চলতি বছরের জানুয়ারিতে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছনোর পর বিশ্ববাজারে সোনার দামে (Gold Price) বড়সড় পতন হয়েছে। জানুয়ারির সর্বোচ্চ স্তর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট গোল্ডের দাম কমেছে প্রায় ২৪ শতাংশ। অথচ ভারতে একই সময়ে সোনার দাম কমেছে প্রায় ২০ শতাংশ। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দর অনেকটা নেমে এলেও ভারতীয় ক্রেতারা তার পুরো সুবিধা পাচ্ছেন না।
এর পিছনে মূলত তিনটি কারণ রয়েছে। সোনার আমদানি শুল্ক বৃদ্ধি, ডলারের তুলনায় টাকার দুর্বলতা এবং জানুয়ারিতে দেশের বাজারে ব্যবসায়ীদের নেওয়া অস্বাভাবিক বেশি প্রিমিয়াম। এই তিনটি বিষয় আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় ভারতের বাজারে সোনার দামের পতনকে সীমিত করেছে।
আমদানি শুল্ক বৃদ্ধিতে দাম কমার প্রভাব কমেছে
গত ২৯ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম প্রতি আউন্স ৫,৩৭৯ ডলারে পৌঁছেছিল। ৬ নভেম্বর তা কমে দাঁড়ায় ৪,০৬৮.৭১ ডলারে। অর্থাৎ, সর্বোচ্চ স্তর থেকে দাম কমেছে প্রায় ২৪ শতাংশ।
অন্যদিকে, অল ইন্ডিয়া সরাফা অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, ধনতেরাসে দিল্লিতে ৯৯.৯ শতাংশ বিশুদ্ধ সোনার দাম ছিল প্রতি ১০ গ্রামে ১,৪৬,৩০০ টাকা। জানুয়ারিতে সেই দাম সর্বোচ্চ ১,৮৩,০০০ টাকায় পৌঁছেছিল। অর্থাৎ, দেশের বাজারে পতনের হার প্রায় ২০ শতাংশ।
এই পার্থক্যের অন্যতম কারণ আমদানি শুল্ক। গত ১৩ মে কেন্দ্রীয় সরকার সোনার উপর কার্যকর আমদানি শুল্ক ৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করে। এর মধ্যে ১০ শতাংশ বেসিক কাস্টমস ডিউটি এবং ৫ শতাংশ Agriculture Infrastructure and Development Cess বা AIDC রয়েছে।
শুল্ক বৃদ্ধির ফলে বিদেশ থেকে সোনা আমদানির খরচ বেড়ে যায়। তাই আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও দেশের বাজারে তার প্রভাব পুরোপুরি পড়েনি।
এর সঙ্গে সোনা কেনার সময় ক্রেতাদের ৩ শতাংশ GST দিতে হয়। গয়না কিনলে তার উপর যোগ হয় মজুরি বা মেকিং চার্জ। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দর কমার অর্থ এই নয় যে ভারতে গয়না, কয়েন বা সোনার বারের দাম একই অনুপাতে কমবে।
টাকার দুর্বলতাও আটকে দিয়েছে দাম কমার গতি
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ কারণ ডলারের তুলনায় ভারতীয় টাকার বিনিময়মূল্য। আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম ডলারে নির্ধারিত হয়। ফলে টাকা দুর্বল হলে একই পরিমাণ সোনা আমদানি করতে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের বেশি টাকা খরচ করতে হয়।
২৯ জানুয়ারি সোনার দাম যখন রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছিল, তখন ডলারের তুলনায় টাকার দাম ছিল প্রায় ৯২ টাকা। পরবর্তী সময়ে মে মাসে তা কমে রেকর্ড ৯৬.৯৬ টাকায় নেমে যায়।
এরপর কিছুটা ঘুরে দাঁড়ায় ভারতীয় মুদ্রা। ৬ নভেম্বর ডলারের তুলনায় টাকার দর বন্ধ হয় ৯৩.৯০৫ টাকায়। Reuters-এর তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারির তুলনায় তখনও টাকা প্রায় ২ শতাংশ দুর্বল ছিল।
অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারে সোনার দাম কমলেও টাকার অবমূল্যায়নের কারণে ভারতীয় বাজারে সেই পতনের পুরো সুবিধা পাওয়া যায়নি। তবে মে মাসের তুলনায় টাকার ঘুরে দাঁড়ানোয় এই চাপ কিছুটা কমেছে।
জানুয়ারির অতিরিক্ত প্রিমিয়ামও কমেছে
আমদানি শুল্ক বৃদ্ধি এবং টাকার দুর্বলতা থাকলে ভারতের বাজারে সোনার দাম আরও কম হারে পড়ার কথা। কিন্তু জানুয়ারিতে দেশের বাজারে ব্যবসায়ীদের নেওয়া অস্বাভাবিক বেশি প্রিমিয়াম পরবর্তী সময়ে দাম কমার ক্ষেত্রে অন্য ভূমিকা নিয়েছে।
Reuters-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় বাজেটের আগে ব্যবসায়ীদের একাংশের ধারণা ছিল, সরকার সোনার আমদানি শুল্ক বাড়াতে পারে। সেই প্রত্যাশায় ২১ জানুয়ারি দেশের বাজারে ব্যবসায়ীরা সরকারি নির্ধারিত দামের তুলনায় প্রতি আউন্সে সর্বোচ্চ ১১২ ডলার পর্যন্ত প্রিমিয়াম নিয়েছিলেন।
কিন্তু ১ ফেব্রুয়ারির বাজেটে আমদানি শুল্ক বাড়ানো হয়নি। মে মাসে সরকার যখন শেষ পর্যন্ত শুল্ক বাড়ায়, তখন বাজারের পরিস্থিতি বদলে যায়। চাহিদা কমে যাওয়া এবং পুরনো সোনা বা স্ক্র্যাপ গোল্ডের সরবরাহ বাড়ার কারণে ব্যবসায়ীরা ক্রেতাদের প্রতি আউন্সে সর্বোচ্চ ২০৭ ডলার পর্যন্ত ছাড় দিতে শুরু করেন।
অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে এই প্রিমিয়াম প্রায় স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে আসে। তখন ব্যবসায়ীরা প্রতি আউন্সে সর্বোচ্চ ৭ ডলার প্রিমিয়াম নিচ্ছিলেন।
ফলে জানুয়ারিতে অস্বাভাবিক বেশি প্রিমিয়াম এবং পরবর্তী সময়ে সেই প্রিমিয়াম কমে যাওয়াও দেশের বাজারে সোনার দামের সংশোধনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছে।
সোনার দাম কমলেও চাহিদায় চাপ
দেশের বাজারে সোনার দাম আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় কম না হওয়ার অর্থ এই নয় যে ভারতীয় ক্রেতারা দামের পতন থেকে একেবারেই বঞ্চিত হয়েছেন। বরং আমদানি শুল্ক, টাকার বিনিময়মূল্য এবং স্থানীয় বাজারের প্রিমিয়াম মিলিয়ে শেষ পর্যন্ত ক্রেতাদের খরচ নির্ধারিত হচ্ছে।
তবে গত বছরের তুলনায় সোনার দাম এখনও অনেকটাই বেশি। গত বছর ধনতেরাসে দিল্লিতে প্রতি ১০ গ্রাম সোনার দাম ছিল ১,৩২,৪০০ টাকা। এ বছর তা বেড়ে হয়েছে ১,৪৬,৩০০ টাকা। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে দাম প্রায় ১০ শতাংশ বেশি।
উচ্চ দামের প্রভাব পড়েছে চাহিদাতেও। World Gold Council-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ভারতে সোনার চাহিদা কমে প্রায় ৬৫০ টনে দাঁড়াতে পারে। ২০২০ সালের পর যা হবে সর্বনিম্ন।
তাই সোনা কেনার পরিকল্পনা থাকলে শুধু আন্তর্জাতিক বাজারের দর দেখলেই হবে না। আমদানি শুল্ক, ডলারের তুলনায় টাকার অবস্থান এবং দেশের বাজারে প্রিমিয়ামের দিকেও নজর রাখা জরুরি। কারণ এই তিনটি বিষয়ই শেষ পর্যন্ত ভারতীয় ক্রেতাকে কত দামে সোনা কিনতে হবে, তা নির্ধারণ করে।
Essential Business Intelligence, Sharp Market Insights, Practical Personal Finance Advice, Daily Fuel, Gold and Silver Prices and Latest Stories – On Kolkata24x7 Business



