চোখের ভাষাতেই ফুটত সম্পর্কের গল্প! আজও অমলিন সৌমিত্র-মাধবীর রসায়ন

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন কিছু জুটি রয়েছে, যাঁদের অভিনয়ের রসায়ন সময়ের সীমানা পেরিয়ে আজও দর্শকের মনে সমানভাবে জায়গা করে আছে। উত্তম কুমার ও সুচিত্রা সেনের পাশাপাশি তেমনই এক স্মরণীয় জুটি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় (Soumitra Chatterjee) ও মাধবী মুখোপাধ্যায় (Madhabi Mukherjee)। তাঁদের জুটির বিশেষত্ব ছিল না কোনও প্রচলিত রোম্যান্টিক নায়ক-নায়িকার সমীকরণ। বরং সম্পর্কের সূক্ষ্মতা, চোখের ভাষা, সংলাপের সংযম এবং না-বলা আবেগকে পর্দায় জীবন্ত করে তোলার অসাধারণ ক্ষমতাই তাঁদের আলাদা পরিচিতি দিয়েছিল। বাংলা সিনেমার স্বর্ণযুগে সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় এই দুই শিল্পীর অভিনয় এক বিশেষ মাত্রা পেয়েছিল।
এই জুটির পর্দার পথচলার অন্যতম উল্লেখযোগ্য অধ্যায় সত্যজিৎ রায়ের ছবি ‘দেবী’। ১৯৬০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই ছবিতে উমাপ্রসাদের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। অন্যদিকে, দয়াময়ীর ভূমিকায় ছিলেন মাধবী মুখোপাধ্যায়। উনিশ শতকের বাংলার সামাজিক প্রেক্ষাপটে কুসংস্কার, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং নারীর অসহায়তার যে ছবি সত্যজিৎ রায় তুলে ধরেছিলেন, সেখানে সৌমিত্র ও মাধবীর অভিনয় ছবির আবেগকে আরও গভীর করে তুলেছিল। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে ভালোবাসা, অসহায়তা এবং বিশ্বাসের দ্বন্দ্ব তাঁদের অভিনয়ে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে ফুটে উঠেছিল।
তবে এই জুটির অভিনয় জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পরিচিতি তৈরি হয় সত্যজিৎ রায়ের ‘চারুলতা’ ছবিতে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটগল্প ‘নষ্টনীড়’ অবলম্বনে নির্মিত এই ছবি মুক্তি পায় ১৯৬৪ সালে। ছবিতে অমলের চরিত্রে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এবং চারুলতার ভূমিকায় মাধবী মুখোপাধ্যায়ের অভিনয় আজও চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে বিশেষভাবে আলোচিত।
এই দুই অভিনেতার জুটির বিশেষত্ব ছিল, তাঁরা কখনও নিজেদের অভিনয়কে নির্দিষ্ট কোনও ছকে আটকে রাখেননি। কখনও স্বামী-স্ত্রী, কখনও ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের দুই মানুষ, আবার কখনও সামাজিক ও মানসিক টানাপোড়েনের মধ্যে থাকা চরিত্র প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিজেদের অভিনয় দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁদের পর্দার রসায়ন ছিল অনেক বেশি বাস্তবধর্মী। ফলে দর্শক চরিত্রগুলির সঙ্গে সহজেই একাত্ম হতে পেরেছেন।
দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এই জুটিকে আবারও একসঙ্গে দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন দর্শক। অনীক দত্ত পরিচালিত ‘বরুণবাবুর বন্ধু’ ছবিতে ফের জুটি বাঁধেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও মাধবী মুখোপাধ্যায়। ২০২০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই ছবিতে নামভূমিকায় অর্থাৎ বরুণবাবুর চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন সৌমিত্র। অন্যদিকে, তাঁর শয্যাশায়ী স্ত্রীর ভূমিকায় দেখা গিয়েছিল মাধবীকে। ছবিতে তাঁদের উপস্থিতি দর্শককে স্বাভাবিকভাবেই ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল বাংলা চলচ্চিত্রের সেই স্বর্ণযুগের স্মৃতিতে।
আরও পড়ুন: ভালোবাসায় নেতিবাচকতা! সম্পর্ক বাঁচাতে কী সিদ্ধান্ত নেন বিরাট-অনুষ্কা?
আসলে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও মাধবী মুখোপাধ্যায়ের জুটিকে শুধুমাত্র কয়েকটি ছবির সাফল্যের নিরিখে বিচার করা যায় না। তাঁদের অভিনয়ের মধ্যে দিয়ে বাংলা চলচ্চিত্রে সম্পর্কের এক ভিন্ন ভাষা তৈরি হয়েছিল। যেখানে প্রেম মানেই শুধু মিলন নয়, ভালোবাসা মানেই শুধু স্বীকারোক্তি নয়। বরং অভিমান, দূরত্ব, দ্বিধা, আকাঙ্ক্ষা এবং নীরবতাও সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁদের অভিনয়ের সেই স্বাভাবিকতা ও গভীরতাই আজও নতুন প্রজন্মের দর্শককে মুগ্ধ করে।
আরও পড়ুন: ‘একটি বাজি ফাটানোও দেশবিরোধী’, দীপাবলির আগে বিস্ফোরক পোস্ট সোনি রাজদানের
উত্তম-সুচিত্রার মতোই সৌমিত্র-মাধবী জুটিও বাংলা সিনেমার ইতিহাসে নিজস্ব জায়গা করে নিয়েছে। সময় বদলেছে, বদলেছে চলচ্চিত্র নির্মাণের ভাষা, কিন্তু ‘দেবী’ কিংবা ‘চারুলতা’র মতো ছবিতে তাঁদের অভিনয়ের আবেদন ফিকে হয়নি। পর্দায় একসঙ্গে তাঁদের উপস্থিতি তাই কেবল দুই অভিনেতার রসায়ন নয়, বাংলা চলচ্চিত্রের এক গৌরবময় অধ্যায়ের স্মারক।
আরও পড়ুন: শাহরুখেরও ছিল সংশয়, করণের জেদেই আইকনিক ‘পু’ হয়ে ওঠেন করিনা!



