উৎসবে ফুলের চাহিদা তুঙ্গে, তবু লোকসানে কালিম্পঙের চাষিরা

কালিম্পং: ঘরে ঘরে তিহার ও দীপাবলির প্রস্তুতি শুরু হতেই কালিম্পঙের বাজারে আসতে শুরু করেছে গাঁদা ফুল। বাড়ির দরজা-জানালায় ঝুলছে লম্বা ফুলের মালা, কোথাও আবার সাজিয়ে…
কালিম্পং: ঘরে ঘরে তিহার ও দীপাবলির প্রস্তুতি শুরু হতেই কালিম্পঙের বাজারে আসতে শুরু করেছে গাঁদা ফুল। বাড়ির দরজা-জানালায় ঝুলছে লম্বা ফুলের মালা, কোথাও আবার সাজিয়ে রাখা হচ্ছে ফুলের গুচ্ছ। কিন্তু উৎসবের মরশুমে ফুলের চাহিদা বাড়লেও তার পুরোপুরি সুফল পাচ্ছেন না স্থানীয় চাষিরা (Flower Farmers)। কারণ, কালিম্পঙের বাজারে বিক্রি হওয়া গাঁদা ফুলের বড় অংশই আসছে শিলিগুড়ি এবং সমতলের বিভিন্ন এলাকা থেকে। অন্যদিকে, স্থানীয় ফুলচাষিরা নিজেদের উৎপাদিত ফুলের জন্য উপযুক্ত বাজার ও ন্যায্য দাম পেতে সমস্যায় পড়ছেন।
একসময় পাহাড়ের বহু বাড়ির উঠোন ও বাগানেই গাঁদা ফুলের চাষ হত। পরিবারের সদস্যরাই সেই ফুল দিয়ে উৎসবের মালা তৈরি করতেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলেছে পরিস্থিতি। এখন অনেক পরিবারকেই উৎসবের জন্য বাজার থেকে ফুল কিনতে হচ্ছে। দশমাইলের বাসিন্দা দেবিকা শর্মা জানিয়েছেন, বাড়িতে ফুল চাষের মতো পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় প্রতি বছর উৎসবের মরশুমে তাঁকে বাজার থেকেই গাঁদা ফুল কিনতে হয়। দাম বেশি হলেও ফুল কেনা ছাড়া উপায় থাকে না বলে জানিয়েছেন তিনি।
উৎসবের বাজারে বড় ব্যবসার সম্ভাবনা
স্থানীয় ফুল বিক্রেতা মনোজ রাই গত পাঁচ বছর ধরে এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তাঁর মতে, কালিম্পংয়ের বাজারে বাইরের এলাকা থেকে ফুল আসার প্রবণতা স্থানীয় চাষিদের জন্য বড় বাণিজ্যিক সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, পরিকল্পিতভাবে ফুল চাষ করতে পারলে একজন কৃষক একটি উৎসবের মরশুমেই ১ লক্ষ টাকার বেশি আয় করতে পারেন।
চলতি মরশুমে ইতিমধ্যেই তাঁর কাছে প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০টি ফুলের মালার অর্ডার এসেছে। এক মিটার লম্বা গাঁদা ফুলের মালার দাম উঠছে ৭০ টাকা পর্যন্ত।
মনোজ রাইয়ের কথায়, কালিম্পংয়ের বহু মানুষ এখনও নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর জন্যই গাঁদা ফুল চাষ করেন। বাণিজ্যিকভাবে এই চাষের সম্ভাবনা নিয়ে সেভাবে ভাবনাচিন্তা শুরু হয়নি। অথচ বাজারে চাহিদা রয়েছে। তবে পাহাড়ে হঠাৎ বৃষ্টি এবং তাপমাত্রা কমে যাওয়া ফুল চাষের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
ন্যায্য দাম না পেয়ে গাছ তুলে ফেলছেন চাষিরা
স্থানীয় ফুলচাষিদের সমস্যাটা শুধু উৎপাদনে সীমাবদ্ধ নয়। বাজারে ফুল নিয়ে যাওয়ার পর উপযুক্ত দাম না পাওয়াও তাঁদের কাছে বড় চিন্তার বিষয়। চেকি শেরপার অভিযোগ, শিলিগুড়ি থেকে আসা ফুল তুলনামূলক কম দামে বিক্রি হওয়ায় স্থানীয় চাষিরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন।
তাঁর কথায়, স্থানীয় চাষিরা জৈব সার ব্যবহার করে এবং নিজেরা নিয়মিত পরিচর্যা করে ফুল ফলান। কিন্তু বাজারে নিয়ে গেলে সেই পরিশ্রমের যথাযথ দাম মেলে না। কখনও ১০০ টাকার ফুলের জন্য মাত্র ২৫ থেকে ৫০ টাকা দাম দেওয়া হয়। এই পরিস্থিতিতে কয়েকজন চাষি উপযুক্ত লাভ না পেয়ে নিজেদের ফুলগাছ তুলে ফেলতেও বাধ্য হয়েছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
পাহাড়ের কিছু এলাকায় বাণিজ্যিক চাষের সম্ভাবনা
বংবস্তির ফুলচাষি বেদপ্রসাদ মনে করেন, কালিম্পংয়ের বিভিন্ন এলাকার আবহাওয়া ও মাটির বৈশিষ্ট্যের কারণে ফুলের উৎপাদনে পার্থক্য দেখা যায়। তবে বংবস্তি ও রেলির মতো তুলনামূলক উষ্ণ এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।
তাঁর মতে, ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি ও উৎসবের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। ফলে ফুলের চাহিদাও ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে। কিন্তু সেই চাহিদার তুলনায় স্থানীয় উৎপাদন এখনও সীমিত। পরিকল্পিতভাবে ফুলচাষকে ব্যবসা হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে পাহাড়ের কৃষকদের সামনে নতুন আয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
জমি, জল ও পরিচর্যার অভাব বড় বাধা
কালিম্পঙের ফুলের দোকান ‘বাগিচা’র কর্ণধার সূরজ প্রধান জানিয়েছেন, শুধু তিহার বা দীপাবলি নয়, বিয়ে এবং বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানেও ফুলের চাহিদা থাকে। ফলে সারা বছরই এই ব্যবসার বাজার রয়েছে। কিন্তু ফুলচাষের জন্য পর্যাপ্ত জমি, জলের ব্যবস্থা এবং দীর্ঘদিন ধরে গাছের পরিচর্যা করার ধৈর্য প্রয়োজন।
তাঁর কথায়, এলাকায় ফাঁকা জমি থাকলেও ফুল চাষের জন্য কয়েক মাস ধরে নিয়মিত যত্ন নিতে হয়। পর্যাপ্ত জলের অভাব এবং পাথুরে মাটিও চাষের ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করে। তবে উৎসব, ধর্মীয় আচার এবং বিয়ের অনুষ্ঠান যতদিন থাকবে, ততদিন ফুলের চাহিদাও থাকবে।
তিহার ও দীপাবলির মরশুমে কালিম্পংয়ের ফুলের বাজারে চাহিদা থাকলেও স্থানীয় চাষিরা সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছেন না। উৎপাদনের পাশাপাশি ন্যায্য দাম, বাজারের সুযোগ এবং চাষের পরিকাঠামো নিশ্চিত করা গেলে গাঁদা ফুলের চাষ পাহাড়ের কৃষকদের কাছে লাভজনক ব্যবসা হয়ে উঠতে পারে।
Essential Business Intelligence, Sharp Market Insights, Practical Personal Finance Advice, Daily Fuel, Gold and Silver Prices and Latest Stories – On Kolkata24x7 Business



