বিষাদের সূর্যাস্ত! রোনাল্ডোর বিদায়ে পৌরুষের জৌলুস হারাল বিশ্বফুটবল

পর্তুগাল ফুটবলের মহাকাব্যে এক যোদ্ধার অধ্যায় শেষ। মেরুন জার্সিতে আর তাঁকে পরীক্ষা দিতে হবে না। নিন্দুকরা হয়তো বলবে তাঁর ঝুলিতে বিশ্বকাপ নেই। কেরিয়ার সায়াহ্নে আবার কোচের সঙ্গে দ্বন্দ্বের চর্চাও পিছু ছাড়েনি তাঁর। কিন্তু তাতে কী যায়ে আসে? তাঁর তুলনা তিনি তো নিজেই। ঈশ্বরের দূত নয়, রক্ত-মাংসের মানুষ হিসেবেই ঐশ্বরিক সব মুহূর্ত তিনি উপহার হিসেবে দিয়েছেন ভক্তদের, দেশকে, বিশ্বকে। নিজের ১০০০ গোলের মাইলফলক থেকে মাত্র ১৫ ধাপ দূরে দাঁড়িয়ে একপ্রকার আচমকাই বলে দিলেন, ‘আমার যাওয়ার সময় হল। দাও বিদায়।’ নভেম্বরের শীতবিকেলে যেন অকাল বৃষ্টি নামল অনুরাগীদের মনে!
আবারও মাঠে নামবে পর্তুগাল। নতুন প্রজন্ম, নতুন রক্ত। ঘাম-রক্ত ঝরাবেন একঝাঁক উঠতি পর্তুগিজ তারকা। সঙ্গে নিশ্চয়ই পাবেন আজকের দিনের প্রতিষ্ঠিত ফুটবলারদের। থাকবেন না শুধু একজন। রোনাল্ডো (Cristiano Ronaldo Retirement)। তাঁর গায়ে মেরুন জার্সিটা থাকবে না। পিছনে লেখা থাকবে না সেই বিখ্যাত ৭ সংখ্যাটা। ক্যামেরা আর খুঁজে পাবে না ‘সিউ’ সেলিব্রেশন। যে মহামানব ম্যাচ, গোল, রেকর্ড কিংবা ট্রফির ঊর্ধ্বে চিরকাল অসংখ্য মানুষকে আগলে রেখেছেন, তাঁরাও সেই রোনাল্ডোর স্মৃতি আগলেই চোখ রাখবেন মাঠের লড়াইয়ে।
শুকনো তথ্য পরিসংখ্যানেই পাতার পর পাতা ভরে যেতে পারে। রেকর্ডের আরেক নাম রোনাল্ডো। রেকর্ডের বাইরেও আছে আরেক রোনাল্ডোর নাম। যে রোনাল্ডো আপনাকে প্রত্যাবর্তনের ম্যাজিক শেখায়। রাতবিরেতে দুঃস্বপ্ন এলে ৭ নম্বর জার্সিধারী হাসি মুখে মাথায় সব ভুলে এগিয়ে যাওয়ার হাত বুলিয়ে দেন।
দেশের হয়ে শেষ ম্যাচ খেলে ফেলেছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। শেষ ম্যাচ। ‘শেষ ম্যাচ’ শব্দটা লিখতে অস্বস্তি হয়। লিখে ফেলার পর অবিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়। কি-বোর্ডে ব্যাকস্পেস আছে। না বলতে চাওয়া অনেক কথা মুছে ফেলা যায়। কিন্তু জীবন? চরৈবতি মন্ত্রে এগিয়ে চলতে চলতে সে যে কখন নির্মম হয়ে উঠবে, তার আন্দাজ করা ক্ষুদ্র মানুষের কাজ নয়। আভাস দিয়েছিলেন বিশ্বকাপের সময়ই। স্পেন ম্যাচের আগে জানিয়ে দিয়েছিলেন বিশ্বকাপ আর খেলবেন না। তখনও সান্ত্বনা ছিল, বিশ্বকাপ না হোক, বিশ্ব ফুটবলে তো ৪১ বছরের সপ্তম আশ্চর্যের দাপট দেখা যাবে। কিন্তু এবার সেই আশাতেও ইতি টেনে দিলেন তিনি। সময় বয়ে যাবে নিজের ছন্দে, তখন শূন্যস্থান আরও স্পষ্ট হবে। ফুটবল আসবে, ফুটবলার যাবে, বিশ্বফুটবল আর কোথায় পাবে পৌরুষের জৌলুস? পারিজাতকে আর বিশ্ব আর কোথায় খুঁজবে?
পর্তুগালের মাদেইরার দরিদ্র পরিবারে বড় হয়ে ওঠা। আর্থিক অনটনের সঙ্গে নিত্য লড়াই করতে করতেই শরীরে ধারণ করেছেন অক্ষয় বর্ম। মানুষ দৈবের বিরুদ্ধে লড়ে। ব্যর্থ হয়। এটাই প্রমাণ, সে মহামানব। সব কিছু না জিতলেও হয়তো চলে। ঈশ্বরপ্রদত্ত শব্দটার সংজ্ঞা রোনাল্ডো বহুদিন হল বদলে দিয়েছেন। কী নিয়ে এসেছি, এটা এখন আর কোনও প্রশ্ন নয়। কথাটা হল, আজ নিজের আয়নায় আপনি কীরকম? আপনি কি আরও একটা দিন লড়াই করার জন্য তৈরি? রোনাল্ডো হওয়ার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এটাই। এই লড়াইটার নাম জীবন, এই লড়াইটার নাম ফুটবল। পর্তুগালকে ফুটবলের মানচিত্রে উজ্জ্বল করার গুরু দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ফিগোর পাশে ১৭ নম্বর জার্সি থেকে ৭ নম্বর জার্সিকে নিজের নামে পরিচিত করে তুলেছেন। পথের শেষে আজ ডেড এন্ড। পথের দুপাশে অসংখ্য রেকর্ডের মাইলফলক। ১৪৬টি আন্তর্জাতিক গোল। একবার ইউরো চ্যাম্পিয়ন, দু’বার উয়েফা নেশনস লিগ খেতাব। শুকনো তথ্য পরিসংখ্যানেই পাতার পর পাতা ভরে যেতে পারে। রেকর্ডের আরেক নাম রোনাল্ডো। রেকর্ডের বাইরেও আছে আরেক রোনাল্ডোর নাম। যে রোনাল্ডো আপনাকে প্রত্যাবর্তনের ম্যাজিক শেখায়। রাতবিরেতে দুঃস্বপ্ন এলে ৭ নম্বর জার্সিধারী হাসি মুখে মাথায় সব ভুলে এগিয়ে যাওয়ার হাত বুলিয়ে দেন।
দেশের স্বার্থে, দশের স্বার্থে জীবনের সবচেয়ে সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেলেছেন ‘স্বার্থপর’ রোনাল্ডো। এই তো কদিন আগেও কত বিতর্ক। দলে শেষ কথা বলবেন কোচই। আর রোনাল্ডো কি না তাঁর সঙ্গেই সম্মুখ সমরে নামলেন! এই কি পেশাদারিত্ব? সোশাল মিডিয়ায় জ্ঞান দেওয়ার লোকের অভাব নেই। আর হ্যাঁ, তাঁদের পাত্তা দেওয়ার মতো সময় বা কারণ, কোনওটাই রোনাল্ডোর হাতেও নেই। তবু কি সকলের মধ্যে থেকেও আলাদা বোধ করছিলেন? যাঁর জন্য, যাঁদের জন্য সব দিয়েছেন, তাঁদের থেকেই বিচ্ছিন্ন মনে করছিলেন নিজেকে? তাই হয়তো বিদায়কাব্যে একটা শব্দ বারবার ঘুরে আসে- ‘পর্তুগাল’। যে জার্সিটা চাপানোর জন্য এতটা পথ পাড়ি দিয়েছেন। লিঙ্গ-বর্ণ-ধর্ম-জাতি নির্বিশেষে পরের প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেছেন। হায় রে ‘হেটার্স’রা। একচোখ খুলে দুনিয়া দেখে আপনারাই বিপদে পড়েছেন। ফ্ল্যাশব্যাকে গিয়ে দেখুন, একটা বাচ্চা ছেলে কাদা, এবড়োখেবড়ো মাঠে দৌড়ে বেরোচ্ছে। আর সময় পেলে জঞ্জাল পরিষ্কার করছে। সেই অস্পষ্ট-আবছা ছবির ছেলেটার সঙ্গে ফুটবলের রঙ্গমঞ্চে কারও সঙ্গে আর কোনও বিবাদ নেই। নেই ভিনগ্রহের প্রতিভার সঙ্গে দর কষাকষি। ঝড়-ঝাপটা সহ্য করে তিনি আজ মহীরূহ। ভালোবাসা তাঁকে শক্তি দিয়েছে, আর ঘৃণা-ব্যঙ্গ করে তুলেছে আরও শক্তিশালী। বিশ্বকাপে গোল করে বলেছিলেন, ‘আই অ্যাম ব্যাক।’ না, আর ফেরা হবে না। এবার শুধু বিচ্ছেদের বিষাদ। ২৩ বছরের স্মৃতি আর ভবিষ্যতে পথচলার জন্য অনেকটা সাহস। বিদায় রোনাল্ডো…
শেয়ার
লিংক



