ট্রাম্পের হাতের পুতুল! রিপাবলিকান হারতেই ফিফা সভাপতির কুশপুতুল পুড়িয়ে হবে সেলিব্রেশন

বিতর্ক যেন কিছুতেই পিছু ছাড়ছে না জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর। এবার ফিফা প্রেসিডেন্টের নামে বানানো হল কুশপুতুল। ইংল্যান্ডের কেন্টের ইডেনব্রিজে বনফায়ার নাইট উপলক্ষে তৈরি করা হয়েছে ইনফান্তিনোর ১১ মিটার উঁচু বিশালাকায় কুশপুতুল। সেখানে তাঁর দুই কানে গোঁজা টাকা। হাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সোনালি মূর্তি। তা পুড়িয়ে সেলিব্রেশনও হবে। বলাই বাহুল্য তাদের লক্ষ্য, ফিফার বিতর্কিত ‘পিস প্রাইজ’।
শুধু তাই নয়, ইনফান্তিনোর হাতে রয়েছে একটি ‘রেড কার্ড হটলাইন’ টোকেন। পাশে রাখা ‘প্রেসিডেন্টস ফর ডামিজ’ নামের একটি বই। সেই বইয়ের পাতায় লেখা, ‘কীভাবে কোটি কোটি টাকা উপার্জন করবেন’। কুশপুতুলের সামনে একটি চাকাযুক্ত ডাস্টবিন ফেলে রাখা হয়েছে ম্যাঞ্চেস্টার সিটির জার্সি এবং ট্রাফিক সিগন্যাল। বুধবার প্রকাশ্যে আনা হয়েছে এই বিশালাকার এই কুশপুতুল। আগামী ৭ নভেম্বর ইডেনব্রিজের বনফায়ার নাইট সেলিব্রেশনের মূল আকর্ষণ হতে চলেছে সেটিই।
১৯৯৪ সাল থেকে বনফায়ার নাইটের অনুষ্ঠানে বিভিন্ন পরিচিত ব্যক্তিত্বকে কুশপুতুলের মাধ্যমে বিদ্রূপ করে আসছে ইডেনব্রিজ বনফায়ার সোসাইটি। ব্রিটেনের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের ব্যঙ্গচিত্র তুলে ধরে প্রতি বছরই চর্চায় থাকে কেন্টের ইডেনব্রিজ বনফায়ার সোসাইটির কুশপুতুল। ২০২৫ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টার্মারের কুশপুতুল উন্মোচন করেন সোসাইটির সদস্যরা। এর আগে ২০১৬ সালে প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এমনই একটি কুশপুতুল তৈরি করা হয়েছিল। তাতে ট্রাম্পের হাতে ছিল হিলারি ক্লিন্টনের জ্বলন্ত কাটা মুন্ডু। ২০২২ সালে আবার এই সোসাইটির ‘সেলিব্রিটি গাই’ হিসাবে জায়গা পেয়েছিলেন ব্রিটেনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাস। সেই কুশপুতুলের শিল্পী আন্দ্রেয়া ডিনসকেও দেখা গিয়েছিল উন্মোচনের অনুষ্ঠানে। তাছাড়াও লিজ ট্রাস, হার্ভে ওয়েনস্টাইন, কেটি হপকিন্স এবং সাদিক খানকে নিয়েও তারা কুশপুতুল তৈরি করেছেন। গত বছর তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্টার্মারের কুশপুতুলের গায়ে সাঁটা ছিল ‘ফার্মার হার্মার’ ব্যাজ।

২০১৬ সাল থেকে ফিফার সভাপতি পদে রয়েছেন ইনফান্তিনো। চলতি বছর একের পর এক বিতর্কে জড়িয়েছে তাঁর নাম। অভিযোগ উঠেছে, ফুটবলের নিয়ামক সংস্থার প্রধানের পদকে কাজে লাগিয়ে ব্যক্তিগতভাবে আর্থিক সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি। এবার সেই বিতর্কই উঠে এসেছে ইডেনব্রিজের নতুন কুশপুতুলে। কুশপুতুল নির্মাতাদের অন্যতম এবং বনফায়ার সোসাইটির সহ-সভাপতি আন্দ্রেয়া ডিনস বলেন, “গত কয়েক বছর ধরে আমাদের অনুষ্ঠানে মূলত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের ব্যঙ্গ করা হয়েছে। এবার সেই গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছিলাম। ইনফান্তিনোকে ব্যঙ্গচিত্রের বিষয় হিসাবে বেছে নেওয়া বেশ উপভোগ্য হয়েছে।”
বিশ্বকাপের অংশীদারিত্ব বিক্রির প্রস্তাব সামনে আসার পর থেকেই একের পর এক মহাদেশীয় ফুটবল সংস্থা মুখ খোলে ফিফার বিরুদ্ধে। কেন এত আপত্তি? তাদের অভিযোগ ছিল, এত বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কারও সঙ্গে আলোচনা পর্যন্ত করা হয়নি। বিভিন্ন দেশের ফুটবল সংস্থা, সদস্য দেশ, এমনকী ফিফার নিজস্ব প্রশাসনিক কমিটিগুলির সঙ্গেও কোনও পরামর্শ করা হয়নি। আচমকাই প্রস্তাবটি প্রকাশ্যে আনা হয়েছে। ফিফার প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার পদ্ধতি নিয়েই তাই প্রশ্ন তুলেছিল তারা।

এর পাশাপাশি বিশ্বকাপে আমেরিকার স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগুনের লাল কার্ড দেখার ঘটনাও বিতর্ক বাড়িয়েছিল। সেই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য ইনফান্তিনোকে অনুরোধ করেছিলেন বলে নিজেই স্বীকার করেছিলেন ট্রাম্প। এই ঘটনার পর অনেকেই তাঁকে ‘ট্রাম্পের হাতের পুতুল’ বলে কটাক্ষ করেছিলেন। আর এবার বনফায়ার সোসাইটির চেয়ারম্যান বিল কামিংস বলেন, “আমরা এই সিদ্ধান্তে খুবই খুশি। কেন ইনফান্তিনোকে এবার বেছে নেওয়া হয়েছে, তা বহু মানুষ বুঝতে পারবেন। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা বিতর্ক শুধু ফুটবল দুনিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। যাঁরা ফুটবল অনুসরণ করেন না, তাঁরাও তাঁর কিছু বিতর্কিত কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অবগত।”
প্রায় একশো বছর ধরে বনফায়ার নাইট পালন করে আসছে ইডেনব্রিজ। তবে বিশালাকার কুশপুতুল তৈরি করে তা পোড়ানোর রীতি শুরু হয় নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি। ব্রিটেনের কেন্টের এই শহরের বনফায়ার নাইটের অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেছেন স্যর উইনস্টন চার্চিলের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বও। আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের হার ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর অস্বস্তি বাড়াতে পারে। কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ায় ট্রাম্পের সঙ্গে ইনফান্তিনোর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, ট্রাম্প পরিবারের সঙ্গে ফিফার আর্থিক লেনদেন এবং বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্ব বেসরকারি সংস্থার হাতে তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে তদন্তে গতি আসতে পারে। প্রয়োজনে ইনফান্তিনোকে সমন পাঠিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখিও করতে পারেন ডেমোক্র্যাটরা।

গত ২৬ জুলাই থেকেই ফিফা ও ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছিলেন হাউস জুডিশিয়ারি কমিটির ডেমোক্র্যাট সদস্যেরা। তাঁদের অভিযোগ, ট্রাম্পের আনুকূল্য পেতে পরিকল্পিতভাবে কাজ করেছেন ফিফা সভাপতি। এত দিন কংগ্রেসে সংখ্যালঘু থাকায় ইনফান্তিনোকে হাজির হতে বাধ্য করার ক্ষমতা ছিল না তাঁদের। এবার সেই পরিস্থিতি বদলাতে পারে। এর মধ্যেই ইনফান্তিনোর চতুর্থবার ফিফা সভাপতি পদে নির্বাচনে দাঁড়ানোর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংস্থার গভর্নেন্স কমিটির প্রাক্তন প্রধান মিগুয়েল মাদুরো। তাঁর দাবি, ফিফার নিয়ম অনুযায়ী তিনবারের বেশি সভাপতি হওয়া যায় না। মাদুরোর কথায়, “ইনফান্তিনো ইতিমধ্যেই তিনবার সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। ফলে চতুর্থবার তাঁর নির্বাচনে লড়া ফিফার নিয়মের বিরোধী।”

২০১৬ সালে ইনফান্তিনোর আমলে ফিফার স্বাধীন কমিটির চেয়ারম্যান হয়েছিলেন পর্তুগিজ আইনজীবী মাদুরো। তবে রাশিয়ার কর্তা ভিতালি মুতকোর নিয়োগে আপত্তি জানানোয় ১০ মাসের মধ্যেই তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়। সেই থেকে ইনফান্তিনোর কট্টর সমালোচক তিনি। মাদুরোর মতে, চতুর্থবার নির্বাচনে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোর্ট অফ আর্বিট্রেশন ফর স্পোর্টসেও যাওয়া উচিত। তাঁর মন্তব্য, “ফিফার নিয়মে সর্বোচ্চ তিনটি মেয়াদের কথা বলা হয়েছে। সেই মেয়াদ পূর্ণ হোক বা আংশিক, নিয়মে তার কোনও পৃথক ব্যাখ্যা নেই।” তবে এত সবের মধ্যেও আলোচনায় ফিফা সভাপতির কুশপুতুল।
শেয়ার
লিংক



