0%

ধেয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় মুরাসু, বাতিল ১৯টি উড়ান, উপকূলে সতর্কতা

নয়াদিল্লি: প্রবল ঘূর্ণিঝড় মুরাসুর (Cyclone Murasu) আশঙ্কায় সতর্ক অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ু ও ওড়িশা। আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, সোমবার গভীর রাত থেকে মঙ্গলবার ভোরের মধ্যে অন্ধ্রপ্রদেশের দক্ষিণ উপকূলে আছড়ে পড়তে পারে ঘূর্ণিঝড়টি। স্থলভাগে প্রবেশের সময় ঝড়ের সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। ইতিমধ্যেই ভারী বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত দক্ষিণ ভারতের একাধিক এলাকা। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে অন্ধ্রপ্রদেশের তিনটি বিমানবন্দরে অন্তত ১৯টি উড়ান বাতিল করা হয়েছে।

ভারতীয় আবহাওয়া দফতর (IMD) জানিয়েছে, ঘূর্ণিঝড় মুরাসু উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে নেল্লোর ও নরসাপুরের মধ্যবর্তী উপকূল অতিক্রম করতে পারে। ওঙ্গোলের কাছাকাছি এলাকায় সোমবার রাত সাড়ে ১১টা থেকে মঙ্গলবার ভোর ৪টের মধ্যে ঝড়টি স্থলভাগে প্রবেশ করার সম্ভাবনা রয়েছে। সেই সময় বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ১০০ থেকে ১১০ কিলোমিটার থাকতে পারে। দমকা হাওয়ার সর্বোচ্চ গতি পৌঁছতে পারে ১২০ কিলোমিটারে।

অন্ধ্রপ্রদেশে বাতিল ১৯টি উড়ান

ঘূর্ণিঝড়ের জেরে অন্ধ্রপ্রদেশের বিজয়ওয়াড়া, বিশাখাপত্তনম এবং তিরুপতি বিমানবন্দরে বিমান পরিষেবা ব্যাহত হয়েছে।

বিজয়ওয়াড়া বিমানবন্দরের অধিকর্তা এম লক্ষ্মী কান্তা রেড্ডি জানিয়েছেন, IndiGo-র ১০টি এবং Air India Express-এর দুটি উড়ান বাতিল করা হয়েছে। এছাড়া বিশাখাপত্তনম বিমানবন্দরে চারটি এবং তিরুপতিতে তিনটি উড়ান বাতিল হয়েছে।

চেন্নাই বিমানবন্দরেও কয়েকটি উড়ান বাতিল করা হয়েছে। যাত্রীদের বিমান সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করে উড়ানের সর্বশেষ পরিস্থিতি জেনে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

জরুরি সাহায্যের জন্য WhatsApp নম্বর চালু

ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় বিশেষ অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা চালু করেছে অন্ধ্রপ্রদেশ সরকার। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়া, গাছ উপড়ে পড়া, দেওয়াল ভেঙে যাওয়া, জল জমে যাওয়া কিংবা অন্য কোনও জরুরি পরিস্থিতিতে বাসিন্দারা WhatsApp-এর মাধ্যমে প্রশাসনকে জানাতে পারবেন।

এর জন্য চালু করা হয়েছে ৯৫৫২৩০০০০৯ নম্বরটি।

প্রশাসনের নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রথমে ওই নম্বরে ‘Hi’ লিখে পাঠাতে হবে। এরপর ‘Services’ থেকে ‘Murasu Cyclone Issues’ এবং ‘Report Issue’ বিকল্প নির্বাচন করতে হবে। অভিযোগ নথিভুক্ত করার জন্য নাম, জেলা ও মণ্ডলের মতো প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে হবে।

এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সঙ্গে প্রশাসনের সরাসরি যোগাযোগ এবং দ্রুত উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

অন্ধ্রপ্রদেশে উচ্চ সতর্কতা, বিদ্যুৎ পরিষেবা সচল রাখার নির্দেশ

অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী এন চন্দ্রবাবু নাইডু প্রশাসনের সমস্ত বিভাগকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। দক্ষিণ উপকূলীয় অন্ধ্রপ্রদেশ এবং রায়লসীমা অঞ্চলে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আগের ঘূর্ণিঝড় অর্ণবের তুলনায় মুরাসুর প্রভাব কিছুটা কম হতে পারে বলে পূর্বাভাসের ভিত্তিতে আশা প্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তবে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে কোনও ঝুঁকি নিতে চাইছে না প্রশাসন।

রাজ্যের বিদ্যুৎ দফতরকেও উচ্চ সতর্কতায় রাখা হয়েছে। বিদ্যুৎমন্ত্রী জি রবি কুমার বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থাগুলিকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ নজরদারি চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন।

অন্ধ্রপ্রদেশে উদ্ধারকারী ও বিদ্যুৎকর্মী পাঠাচ্ছে তামিলনাড়ু

প্রতিবেশী অন্ধ্রপ্রদেশকে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছে তামিলনাড়ু সরকার। রাজ্যের তরফে জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর তিনটি দল পাঠানো হয়েছে। এই দলগুলিতে মোট ৯০ জন সদস্য রয়েছেন।

পাশাপাশি বিদ্যুৎ পরিষেবা পুনরুদ্ধারের জন্য ২৫টি দল পাঠানো হচ্ছে। এই দলগুলিতে মোট ৫০০ জন বিদ্যুৎকর্মী এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম রয়েছে।

অন্যদিকে, কর্নাটক সরকারও ৫০০ জন দক্ষ বিদ্যুৎকর্মী ও সরঞ্জাম পাঠানোর ঘোষণা করেছে। ঘূর্ণিঝড় অর্ণবের জেরে ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যুৎ পরিকাঠামো পুনরুদ্ধারে তাঁরা সাহায্য করবেন।

চেন্নাইয়ে ভারী বৃষ্টি, বন্ধ স্কুল

রবিবার রাত থেকেই চেন্নাই, চেঙ্গলপট্টু এবং তিরুভাল্লুর জেলার বিভিন্ন এলাকায় ভারী বৃষ্টি চলছে। পরিস্থিতি বিবেচনা করে সোমবার চেন্নাইয়ের স্কুল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন।

আবহাওয়া দফতর চেন্নাই এবং তিরুভাল্লুরে অতি ভারী বৃষ্টির সতর্কতা জারি করেছে। পাশাপাশি চেঙ্গলপট্টু, কাঞ্চিপুরম, রানিপেট, ভেলোর এবং নীলগিরি জেলায় ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে।

IMD জানিয়েছে, ঘূর্ণিঝড়টি সম্পূর্ণভাবে উপকূল অতিক্রম করার পরেই বৃষ্টির তীব্রতা কমতে পারে।

ওড়িশায় প্রস্তুত ৩০০-র বেশি উদ্ধারকারী দল

ঘূর্ণিঝড় মুরাসুর প্রভাবে দক্ষিণ ওড়িশার একাধিক জেলায় ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে গঞ্জাম, গজপতি, রায়গড়া, কোরাপুট এবং মালকানগিরি জেলায় সতর্কতা বাড়ানো হয়েছে।

ওড়িশার বিপর্যয় মোকাবিলা মন্ত্রী সুরেশ পূজারি জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট জেলার জেলাশাসকদের সতর্ক করা হয়েছে। NDRF, Odisha Disaster Rapid Action Force (ODRAF) এবং দমকল বাহিনীর ৩০০টিরও বেশি উদ্ধারকারী দল প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরানোর কাজও চলছে। দক্ষিণ ওড়িশার কয়েকটি জেলায় ৩ নভেম্বর পর্যন্ত স্কুল ও কলেজ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এদিকে, ধসের ঘটনায় নিখোঁজ ১০ জনের সন্ধানে চলা উদ্ধার অভিযানও নতুন দুর্যোগের কারণে প্রভাবিত হতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ফসলের ক্ষতির আশঙ্কায় কৃষকরা

ঘূর্ণিঝড় অর্ণব এবং পরবর্তী বন্যায় ওড়িশার বিস্তীর্ণ কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তার মধ্যেই নতুন ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কায় উদ্বেগ বেড়েছে কৃষকদের।

সবচেয়ে বেশি ধানচাষের ক্ষতি হয়েছে গঞ্জাম জেলায়। বহু জমি এখনও জলমগ্ন। নতুন করে ভারী বৃষ্টি হলে কাটার উপযুক্ত হয়ে ওঠা ফসলেরও বড় ক্ষতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।

ওড়িশার স্পেশাল রিলিফ কমিশনার রাজেশ পি পাটিল জানিয়েছেন, ঘূর্ণিঝড় অর্ণব এবং পরবর্তী বন্যায় প্রায় ১ লক্ষ ১৮ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ক্ষতি হয়েছে ১,৬৭২টি বাড়ির। প্রভাব পড়েছে ৭৫,৩৮৮ হেক্টর কৃষিজমিতে।

তবে কৃষি দফতরের প্রাথমিক হিসাবে ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের জমির পরিমাণ প্রায় ৯০ হাজার হেক্টর।

মুখ্যমন্ত্রী মোহনচরণ মাঝি ইতিমধ্যেই ঘূর্ণিঝড় অর্ণবে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বিশেষ ত্রাণ প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। মুরাসুর ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়নের পর সেই প্যাকেজ পুনর্বিবেচনা করা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাব্য গতিপথ ও বৃষ্টিপাতের পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে প্রশাসন। উপকূলবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের সরকারি সতর্কবার্তা মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

Related Articles

Back to top button

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker