মেদেইরার ফুটপাথ থেকে ‘সপ্তম আশ্চর্য’, কতটা ‘পাথর’ হলে পরে মানুষ ক্রিশ্চিয়ানো হয়ে যায়?

হাউ মেনি রোডস মাস্ট আ ম্যান ওয়াক ডাউন/বিফোর ইউ কল হিম আ ম্যান…
ধবধবে সাদা টি-শার্টের হাতা গুটিয়ে রক্তমাংসের এক ‘ভাস্কর্য’ গড়গড়িয়ে একখানা চিঠি পড়ে চলেছে। বিষাদের চিঠি। বিদায়ের চিঠি। তেইশ বছরের ফুটবল-পূর্ণিমা শেষে, সফর-সমাপ্তির চিঠি। দেশবাসীর উদ্দেশে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর (Cristiano Ronaldo) নিজেরই লেখা, ফুটবল জীবনের অন্তিম চিঠি। অবসরের চিঠি!
বৃহস্পতিবার ভারতীয় সময় বিকেল চারটেয় যে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে চিরবিদায় জানিয়ে দিলেন রোনাল্ডো। মিনিট কয়েকের এক ভিডিও বার্তায়। এর পরেও ক্লাব ফুটবল খেলবেন সিআর। আল নাসেরের জার্সিতে। ছুটবেন সহস্র গোলের পিছনে। তাড়া করবেন সে মোক্ষকে। কিন্তু আন্তর্জাতিক ফুটবলে আর দেখা যাবে না সিআরকে। পর্তুগালের লাল জার্সিতে আর দেখা যাবে না তাঁর ‘ভূমি থেকে আকাশ’ ক্ষেপণাস্ত্র-লাফ। আর শোনা যাবে না তাঁর উদ্ধত তর্জন, শব্দভেদী ‘সিইউউ’ গর্জন। শেষ, সব শেষ।
বৃহস্পতিবার রোনাল্ডোর অবসর-ভিডিও নির্নিমেষে দেখতে-দেখতে বিস্মিত লাগছিল। আচ্ছা, কতটা ‘পাথর’ হলে পরে মানুষ ক্রিশ্চিয়ানো হয়ে যায়? ভিডিওর ‘ব্যাকড্রপে’ ফিরে-ফিরে আসছিল অতীত। কখনও সোনার। কখনও শোকের। ওই যে দেখছি, হাতে ঝাড়ু নিয়ে মেদেইরার রাস্তা পরিষ্কার করছেন কিশোর ক্রিশ্চিয়ানো, ঠোঁটে একরাশ হাসি নিয়ে, দু’টো পয়সা যাঁর কাছে অভাবের স্বর্গ। ২০২২ বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কোর কাছে হারের প্রহরও দেখলাম বুঝি। সবুজ গালিচায় কান্নায় ভেঙে পড়ছেন সিএআর। আর তাঁর কান্নাভেজা চোখে সান্ত্বনার পরশ বুলিয়ে চলে যাচ্ছে কোনও এক ব্যস্ত প্রজাপতি। আবার এক দশক আগে তাঁর প্রথম ইউরো জয়ের হিংস্র গর্জন, টলমল পায়ে এক অজ্ঞাত শিশুর তাঁর প্রখ্যাত ‘স্টেপ ওভারের’ পুঁচকে প্রচেষ্টা– সে সবও তো দেখলাম অবিরাম। শুধু হাতে চিঠি নিয়ে সোফায় বসা অবয়বের কোনও বিকার নেই! তাপ-উত্তাপ নেই! মন দিয়ে সে শুধু লেখাটা পড়ছে। গড়গড়িয়ে খবর পড়ার মতো করে। নির্বিচারে। নির্বিরোধে।
তেইশ বছর লাগে বুঝি ফুটবলে পুরুষ-মানুষ হতে! তেইশ বছর লাগে বুঝি, আবেগকে চিরতরে পাঁচ গোল দিতে! কী জানি, ভুল লিখলাম হয়তো। পৃথিবীর সমস্ত বিখ্যাত সাত নম্বররাই বোধহয় হন এমন। ফুটবলে। ক্রিকেটে। জীবনের কোনও না কোনও প্রান্তে এসে তাঁরা নির্লিপ্ত হয়ে যেতে শেখেন। কেন, মহেন্দ্র সিং ধোনির অবসর মনে নেই? ক্রিকেটের ভুবনবিখ্যাত নাম্বার সেভেন? স্রেফ দু’লাইন লিখে চির-অন্তরালে চলে গিয়েছিলেন যিনি। ভিডিও ব্যাকড্রপে সাফল্যের স্বর্গসুখের সঙ্গে ব্যর্থতার চিতাভস্ম সাজিয়ে। আবেগকে বিন্দুমাত্র পরিসর না দিয়ে। সিআর দু’লাইন লেখেনননি। বিশাল অবসর-চিঠি লিখেছেন। তা পড়েছেন। শুধু পড়ার সময়, তাঁর মুখাবয়বের একটা পেশিও চিলতে নড়েনি।
‘লাইক আ ম্যান’। প্রকৃত পুরুষসিংহের মতো। যাঁরা খেলা ছেড়ে যাওয়ার সময় পৃথিবী কাঁদে। তাঁরা কাঁদেন না!

হাউ মেনি ইয়ার্স ক্যান সাফ পিপল এক্সিস্ট/বিফোর দে আর অ্যালওড টু বি ফ্রি…
লিওনেল মেসির কুড়ি বছর লেগেছিল। ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর তেইশ বছর লাগল, দেশকে ফুটবল-গারদ থেকে বার করে আনতে! ২৩৪ ম্যাচে ১৪৬ গোল লাগল নিজেকে দেশজ দায় থেকে মুক্ত করতে। বৃহস্পতিবার রোনাল্ডোর অবসরের খবর আগাম কেউ কিস্যু জানতেন বলে মনে হয় না। পর্তুগিজ পত্রপত্রিকা দেখলাম খবর করেছে যে, জাতীয় কোচ জর্জে জেসুস নাকি পরের আন্তর্জাতিক ম্যাচে সিআরকে দলে রাখবেন বলে ভেবেছিলেন। পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশন সদর্পে জানিয়েছে, কিছুতেই তারা দেশের সর্বশ্রেষ্ঠ ফুটবল-কুলদেবতাকে এমন টিমটিমে ভাবে যেতে দেবে না। বরং তারা মহার্ঘ প্রস্থান-পরিকল্পনা করবে।
আর ভাবনা! আর পরিকল্পনা! ফুটবল-সূর্যাস্ত লগ্নে রোনাল্ডোকে কেউ যদি সবচেয়ে ব্যতিব্যস্ত করে থাকেন, জ্বালিয়ে থাকেন, তাঁরা এঁরা। কোচ জেসুস। এবং পর্তুগাল ফুটবল ফেডারেশনের প্রধান পেদ্রো গার্সিয়া। যাঁদের কথার খিলাপের জেরে পর্তুগাল শিবির পর্যন্ত ছেড়ে গিয়েছিলেন রোনাল্ডো! জেসুস তো সাংবাদিক সম্মেলনে সরাসরি অপমান করে দিয়েছিলেন পর্তুগাল ফুটবলের জাতীয় সম্পদকে। সঠিক জানি না, সিআরের দুম করে এ হেন সরে যাওয়ার কারণ কী? জানি না, পুনরায় দু’পক্ষে খটাখটি লেগেছিল কি না? আগামীতে জানা যাবে নিশ্চয়ই। তবে আসন্ন প্রেস কনফারেন্সে রোনাল্ডো নিয়ে নানাবিধ প্রশ্নের গোলা-বর্ষণে যে আক্রান্ত হবেন জেসুস, নির্দ্বিধায় লিখে ফেলা যায়। আফটার অল, পর্তুগালকে ফুটবল-মানচিত্রে পাকাপাকি সিআরই তুলে এনেছিলেন যে। সে দেশ অতীতে ইউসেবিও-ফিগোর মতো ফুটবলার গর্ভে ধারণ করেছে বটে। তাঁরা নিজ দ্যুতিতে বিশ্ব ফুটবলকে আলোকিতও করেছেন। কিন্তু কেউ তাঁরা সিআর সেভেন হতে পারেননি। পর্তুগালের আগামী পাঁচ প্রজন্মে কেউ পারবেন বলে মনে হয় না।
দেশের হয়ে কী কী সব ম্যাচ খেলেছেন রোনাল্ডো! কী সমস্ত গোল করেছেন! মানছি, বিশ্বকাপ তিনি জেতেননি। ছ’বার খেলেও পারেননি। বিশ্বকাপের সঙ্গে রোনাল্ডোর বরাবর প্রেম-ঘৃণার সম্পর্ক সমান্তরাল থেকে গিয়েছে। কিন্তু কে ভুলতে পারবে, রাশিয়া বিশ্বকাপে স্পেনের বিরুদ্ধে তাঁর হ্যাটট্রিক, পিকে-বুস্কেতস-র্যামোসদের বিরুদ্ধে একা লড়ে যাওয়া? কে ভুলতে পারবে, ইউরো ২০১৬-য় গ্রুপ পর্বে হাঙ্গেরির বিরুদ্ধে তাঁর জোড়া গোল? যা স্রেফ নকআউট পৌঁছে দেয়নি পর্তুগালকে। পরে ট্রফিটাও জিতিয়ে দিয়েছিল।

চল্লিশ বছরেও নেশনস লিগ ফাইনালে স্পেনের বিরুদ্ধে গোল করেছেন সিআর। অধিনায়ক হিসাবে সর্বমোট তিন-তিনটে ট্রফি (দু’টো নেশনস লিগ, একটা ইউরো) দিয়েছেন দেশকে। ভুল হতে পারি। কিন্তু কোথাও গিয়ে মনে হয়, কোচ-ফেডারেশনের সঙ্গে লাঠালাঠি নিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন সিআর। নিজেকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন এ সমস্ত ঝঞ্ঝা থেকে। লামিন ইয়ামালের জন্মের চার বছর আগে থেকে খেলা শুরু করেছিলেন রোনাল্ডো। দেশের ফুটবলকে ‘শাবক’ থেকে ‘শ্বাপদ’ করেছেন। আর কত? এক জীবনে আর সয় কত? বব ডিলান অনুসরণ করে পরিচ্ছদ ভাগ করছিলাম এতক্ষণ। সেই ডিলানই তো লিখে গিয়েছেন, ‘হাউ মেনি টাইমস ক্যান আ ম্যান টার্ন হিজ হেড/অ্যান্ড প্রিটেন্ট দ্যাট হি জাস্ট ডাজন’ট সি?’ কী জানেন, যেতে পারলে, সব সময় ‘কেন যাব’ বলা উচিত নয়। বরং যেতে পারলে, কখনও কখনও চলে যাওয়াই ভালো!
ওয়েল ডান ওল্ড ম্যান, ওয়েল ডান। নিশ্চিন্তে যান। বিশ্রাম নিন। অবসর-যাপন করুন শান্তিতে। এ পৃথিবীতে থাকল তো আপনার প্রিয় ‘যাজক’-রা, ভিনিসিয়াস-রড্রিগো-রাসমুস হয়ল্যান্ডরা, যাঁরা ঠিকই সময়ে-অসময়ে ‘সিইউউউ-ধর্ম’ প্রচার করে যাবেন, মনে পড়িয়ে দেবেন আপনাকে। অবসর ভিডিওয় শতভাগ সত্য বলেছেন আপনি। ফুটবলারের বিচার গোল করে না, ট্রফি করে না, রেকর্ড করে না। করে মানুষ।
কেউ না জানুক। মানুষ তো জানবে, অনন্ত ক্ষুধা আর সাফল্যের উদগ্র বাসনা থাকলে মেদেইরার ফুটপাথ থেকেও মহাকাশ যাওয়া যায়! সৃষ্টি করা যায় সপ্তম আশ্চর্য!
শেয়ার
লিংক



