0%

খুলনা রেলস্টেশনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ম্যুরালে কালি লেপে বিকৃত, বাংলাদেশে তীব্র ক্ষোভ

 

ঢাকা, ৭ নভেম্বর : বাংলাদেশে ফের নোবেলজয়ী কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতি বিকৃত করার ঘটনা সামনে এল। খুলনা রেলস্টেশনের সীমানা প্রাচীরে আঁকা রবীন্দ্রনাথের ম্যুরালে কালো কালি লেপে দিয়েছে দুষ্কৃতীরা। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় ব্যাপক ক্ষোভ ও নিন্দার সৃষ্টি হয়েছে। এক সাংস্কৃতিক কর্মীর সন্দেহ, এর পিছনে কোনও সংগঠিত গোষ্ঠীর হাত থাকতে পারে।

ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে খুলনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক লোকমান হোসেন জানান, শুক্রবার দুপুরে পুলিশ এই ঘটনার খবর পায়। এরপরই তদন্ত শুরু করা হয়েছে। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম ‘ঢাকা ট্রিবিউন’-কে তিনি জানান, শুক্রবার রাস্তার বিপরীত দিকের সমস্ত দোকানপাট বন্ধ থাকায় কারা এবং কখন ম্যুরালটি বিকৃত করেছে, তা চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের খুলনা সফরের আগে খুলনা সিটি কর্পোরেশন (কেসিসি) শহরের বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বিষয় তুলে ধরতে এই ম্যুরালগুলি আঁকার উদ্যোগ নিয়েছিল।

ম্যুরালগুলিতে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান, সুন্দরবন, ঐতিহাসিক ষাট গম্বুজ মসজিদ এবং পাটশিল্পের পাশাপাশি এই অঞ্চলের শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অবদান রাখা বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের তুলে ধরা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কাজী নজরুল ইসলাম।

পুরনো যশোর রোডের পাশের দেওয়ালে ফকির লালন শাহ, শিল্পী এস এম সুলতান, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের প্রতিকৃতি আঁকা হয়েছিল। কিন্তু তাঁদের মধ্যে একমাত্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতিটিই কালো কালি দিয়ে বিকৃত করা হয়েছে।

ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে খুলনা সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, প্রতিকৃতি বিকৃত করার মধ্য দিয়ে দুষ্কৃতীরা নিজেদের সংকীর্ণ মানসিকতা ও অসুস্থ চিন্তাধারার পরিচয় দিয়েছে।

সাংস্কৃতিক সংগঠন নাট্যালোকের সাধারণ সম্পাদক ও সাংস্কৃতিক কর্মী শরিফুল ইসলাম সেলিমের সন্দেহ, এর পিছনে একটি সংগঠিত গোষ্ঠী রয়েছে। বাংলাদেশের সংবাদপত্র ‘দ্য ডেইলি স্টার’-কে তিনি জানান, ঢাকাতেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। পরিকল্পিতভাবে এই কাজগুলি করা হচ্ছে। দোষীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি। তাঁর আশঙ্কা, রবীন্দ্রনাথের পর অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের প্রতিকৃতিও নিশানা করা হতে পারে।

সেলিম আরও বলেন, রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও দর্শন প্রজন্মের পর প্রজন্মকে মুক্তচিন্তা, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং মানবিক মর্যাদার শিক্ষা দিয়েছে। কিছু তরুণকে ভুল পথে পরিচালিত করে এ ধরনের নিন্দনীয় কাজে যুক্ত করা হচ্ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে রবীন্দ্রনাথকে উল্লেখ করে সেলিম সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে এই ঘটনার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

উল্লেখ্য, প্রায় এক মাস আগেও ঢাকায় বাংলাদেশ শিল্পকলা অ্যাকাডেমির বাইরে রবীন্দ্রনাথের একটি গ্রাফিতি ম্যুরালে কালো কালি লেপে বিকৃত করার ঘটনা ঘটেছিল।

গত মাসে ঢাকার ওই ঘটনার প্রতিবাদে বাংলাদেশের অন্তত ৩৭ জন বিশিষ্ট নাগরিক গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, একটি বিবৃতিতে তাঁরা সতর্ক করে বলেন, এ ধরনের ঘটনা বাড়তে থাকলে ধর্মীয় উগ্রপন্থীরা উৎসাহিত হতে পারে এবং বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে।

বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীরা স্মরণ করিয়ে দেন, ১৯৬০-এর দশকে পাকিস্তানের শাসকরা রাজনৈতিকভাবে রবীন্দ্রনাথকে মুসলিমবিরোধী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলেন। সেই সময়ের প্রচারের সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর প্রতিকৃতি বিকৃত করার ঘটনার তুলনাও করেন তাঁরা।

বিবৃতিতে বলা হয়, ভাষা, সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতি সমগ্র মানবজাতির অবিভাজ্য ঐতিহ্য। ধর্মীয়, ভৌগোলিক কিংবা আদর্শগত পার্থক্যের অজুহাতে এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বিভক্ত করা উচিত নয়।

— আইএএনএস (IANS)

Related Articles

Back to top button

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker